ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে যেসব ব্যক্তিত্ব গভীর প্রভাব রেখে গেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম বায়েজিদ বোস্তামি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিনি পরিচিত হয়ে আছেন জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহপ্রেমের প্রতীক হিসেবে। অনেকেই তাকে ‘সুলতানুল আরেফিন’ বা আরেফদের সম্রাট বলে অভিহিত করেন।
ইরানের বাস্তাম নগরে খ্রিষ্টীয় ৮০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবু ইয়াজিদ তাইফুর ইবনে ঈসা আল-বিস্তামি, যিনি ইতিহাসে বায়েজিদ বোস্তামি নামে অধিক পরিচিত। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। ছোটবেলা থেকেই তিনি জাগতিক বিষয় থেকে দূরে থেকে আত্মিক উন্নতির পথে মনোযোগী হয়ে ওঠেন।
বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বায়েজিদ বোস্তামির পরিচিতি সবচেয়ে বেশি তার মায়ের প্রতি ভালোবাসার গল্পের মাধ্যমে। প্রচলিত সেই কাহিনিতে বলা হয়, গভীর রাতে মায়ের জন্য পানি আনতে গিয়ে তিনি সারা রাত পানির গ্লাস হাতে অপেক্ষা করেছিলেন, যাতে মায়ের ঘুম ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে পানি দিতে পারেন।
যদিও এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবুও এটি দীর্ঘদিন ধরে নৈতিক শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার অংশ হয়ে আছে।
সুফিবাদের বিকাশে বায়েজিদ বোস্তামির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ফানা’ বা আত্মবিলয়ের ধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যতক্ষণ নিজের অহং ও আত্মগরিমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ প্রকৃত আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব নয়।
তার বিভিন্ন বক্তব্য ও শিক্ষায় আত্মশুদ্ধি, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মানুষকে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধির প্রতিও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বায়েজিদ বোস্তামির নামে প্রচলিত বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ও উক্তি পরবর্তী সময়ে সুফিবাদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে মক্কা সফর নিয়ে তার বর্ণনাগুলো আত্মিক উপলব্ধির বিভিন্ন স্তরকে রূপকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করেন গবেষকেরা।
তার একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘আমি স্বপ্নে আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে পৌঁছার পথ কী? তিনি বললেন, নিজেকে ত্যাগ কর; দেখবে পৌঁছে গেছ।’
সুফি চিন্তাধারায় এই বক্তব্যকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হওয়ার শিক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
অলৌকিক ঘটনার প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে তিনি শরিয়ত ও নৈতিকতার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, ‘তোমরা যদি কাউকে বাতাসে উড়তে দেখো, তবুও তাকে অলি মনে করো না। বরং দেখো, সে শরিয়তের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে কি না।’
ধারণা করা হয়, ৮৭০ সালের পর কোনো এক সময়ে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং নিজ জন্মস্থান বাস্তামে সমাহিত হন। মৃত্যুর পর তার প্রভাব ও জনপ্রিয়তা আরও বিস্তৃত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠে নানা ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অবস্থিত বায়েজিদ বোস্তামির মাজারও দীর্ঘদিন ধরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। যদিও তার সেখানে আগমনের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
আজও বায়েজিদ বোস্তামির জীবন ও শিক্ষা মানুষকে আত্মশুদ্ধি, বিনয় এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের পথে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
সিএ/এমআর


