পৃথিবীতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হলো ঘুম। দৈনন্দিন পরিশ্রমের পর শরীর ও মনকে বিশ্রাম দিতে ঘুমের বিকল্প নেই। তবে পরকালের চিরস্থায়ী আবাস জান্নাতে মানুষের কি ঘুমের প্রয়োজন হবে—এ প্রশ্ন বহু মানুষের মনে আসে। কোরআন, হাদিস ও ইসলামী তাফসিরের আলোচনায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
ইসলামী শিক্ষায় জান্নাতকে এমন এক আবাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে ক্লান্তি, দুঃখ, অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা মৃত্যুর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। জান্নাতবাসীদের জীবন হবে অফুরন্ত সুখ, প্রশান্তি ও আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ। ফলে দুনিয়ার মতো বিশ্রামের জন্য ঘুমের প্রয়োজন সেখানে থাকবে না বলে আলেমরা মত দিয়েছেন।
কোরআনে ঘুমকে আল্লাহর একটি বিশেষ নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের নিদ্রাকে আমি করেছি বিশ্রামের মাধ্যম।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণস্বরূপ, ঘুমকে করেছেন বিশ্রামের মাধ্যম এবং দিনকে করেছেন (কর্মে ও জীবনে) জেগে ওঠার সময়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭)
তাফসিরকারদের মতে, পৃথিবীতে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতেই ঘুমের প্রয়োজন হয়। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর ঘুম মানুষকে নতুন শক্তি ও সতেজতা ফিরিয়ে দেয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৪/৫৩৭)
কিন্তু জান্নাতের জীবন হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে মানুষ কখনো ক্লান্ত হবে না, অবসাদে ভুগবে না কিংবা কোনো ধরনের দুর্বলতা অনুভব করবে না।
আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং সেখান থেকে তারা বহিষ্কৃতও হবে না।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৮)
এ আয়াতের আলোকে আলেমরা বলেন, যখন ক্লান্তিই থাকবে না, তখন ক্লান্তি দূর করার জন্য ঘুমের প্রয়োজনও থাকবে না।
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, জান্নাতবাসীদের দেহে যেমন ক্লান্তি আসবে না, তেমনি তাদের অন্তরেও কোনো দুঃখ, বিরক্তি বা অশান্তি থাকবে না। পৃথিবীতে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত ও পরিশ্রম করেছেন। জান্নাতে প্রবেশের পর তাদের ওপর থেকে সব ধরনের ইবাদতের দায়িত্ব উঠে যাবে এবং তারা শুধু অফুরন্ত নিয়ামত উপভোগ করবেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৫/২৬২)
ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, জান্নাতে প্রবেশের পর মানুষ পৃথিবীর সব দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। জীবিকার চিন্তা, মৃত্যুভয়, অসুস্থতা, কষ্ট কিংবা মানসিক অশান্তি—কোনোটিই সেখানে থাকবে না। (তাফসিরে তাবারি, ২২/৪৩৪)
জান্নাতে ঘুম না থাকার বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ হাদিসও রয়েছে। এক সাহাবি রাসুল (সা.)–কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, জান্নাতের অধিবাসীরা কি ঘুমাবে?’
তিনি বললেন, ‘ঘুম হলো মৃত্যুর সহোদর। আর জান্নাতবাসীরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪৪১৬)
আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) খাদিজা (রা.)–এর জন্য জান্নাতে একটি বিশেষ প্রাসাদের সুসংবাদ দিয়ে বলেন, ‘সেখানে কোনো হইচই থাকবে না, থাকবে না সামান্যতম ক্লান্তি বা অবসাদ।’ (সহিহুল জামে, হাদিস: ১৩৬৮)
ইসলামী শিক্ষায় জান্নাতকে পূর্ণ জাগরণ, প্রশান্তি ও চিরস্থায়ী সুখের আবাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে মানুষের কোনো দুর্বলতা, ক্লান্তি কিংবা বিশ্রামের প্রয়োজন থাকবে না। তাই কোরআন, হাদিস ও তাফসিরের আলোচনার ভিত্তিতে আলেমরা বলেন, জান্নাতে ঘুমের প্রয়োজন অনুভূত হবে না।
সিএ/এমআর


