জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পরীক্ষার পেছনে থাকে সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও পরিবারের নীরব সমর্থন। একজন শিক্ষার্থীর জন্য সেই যাত্রা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন প্রতিটি ব্যর্থতা ও সাফল্যের মুহূর্তে পাশে থাকেন বাবা-মা। এমনই এক বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিসা রুশদ।
তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে ভর্তির সময় সরকারি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে পরিবারের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথেই প্রশ্নপত্র নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়। কয়েকটি অঙ্ক ভুল হওয়ায় মায়ের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। সেই অভিজ্ঞতার পর থেকেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে বাবাকেই সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
পরের বছর ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের ভর্তি মৌখিক পরীক্ষায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। সাক্ষাৎকার বোর্ডে বাবা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়ে দেন, তাঁর মেয়ে নাচতে পারে। অথচ বাস্তবে নাচের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না নাফিসার।
পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর হয়ে ওঠে যখন পরীক্ষক তাকে নাচ দেখাতে বলেন এবং বাবাকে গান গাইতে অনুরোধ করেন। বাবাও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে গান শুরু করেন। নাচ না জানা সত্ত্বেও বাবার কথাকে সত্য প্রমাণের চেষ্টা করেন নাফিসা। পরে জানা যায়, সেই পরীক্ষাতেই তিনি ভর্তির সুযোগ পান। তবে সেই সাফল্যে বাবার আত্মবিশ্বাস নাকি নিজের চেষ্টা—কোনটি বেশি ভূমিকা রেখেছিল, তা আজও রসিকতার বিষয় হয়ে আছে।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রত্যাশামতো না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধের শুরুতেই কিছুটা পিছিয়ে পড়েন তিনি। এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে বাবাই ছিলেন তাঁর একমাত্র সঙ্গী। চট্টগ্রাম থেকে দিনাজপুর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রতিবারই পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করেছেন বাবা।
তিনি বলেন, প্রতিটি পরীক্ষা শেষে বাবাকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতেন। পরীক্ষা কেমন হয়েছে—এ নিয়ে কোনো চাপ ছিল না। বরং বাবার সেই নীরব উপস্থিতিই তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে।
নোয়াখালীতে একটি পরীক্ষা শেষে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাবাকে জানিয়েছিলেন, এবার নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সেই ব্যর্থতা তাকে ভেঙে দিলেও বাবার নিরন্তর সমর্থনই আবার নতুন করে লড়াই করার শক্তি দেয়।
অবশেষে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দিন বাবার সঙ্গে হলের সামনে বিদায়ের মুহূর্তটি আজও তার স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
ছোট একটি ট্রাংক, তোশক-বালিশ আর নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে হলে প্রবেশের সময় তিনি জানতেন, পেছনে তাকালে হয়তো বাবার চোখের অশ্রু দেখতে পাবেন। তাই আর ফিরে তাকাননি।
পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আরেকজন বাবাকে একইভাবে মেয়েকে বিদায় দিতে দেখে নিজের সেই দিনের স্মৃতি ফিরে আসে। তখন উপলব্ধি করেন, একজন সন্তানের শিক্ষাজীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে অনেক সময় বাবার নীরব সংগ্রামও সমানভাবে জড়িয়ে থাকে।
তার বিশ্বাস, সন্তানের স্বপ্নপূরণের পথে পরিবারের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও ত্যাগই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সিএ/এমআর


