রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার ময়েনপুর মহল্লার ঈদগাহ মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক বটগাছ আজ স্থানীয় মানুষের গর্বের প্রতীক। মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে, গাছটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর। যদিও এর সঠিক বয়স নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তবে দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তৃত হয়ে এটি প্রায় এক বিঘা জমিজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। অসংখ্য স্তম্ভমূলের কারণে মূল কাণ্ডটি আলাদা করে চিহ্নিত করাও এখন কঠিন।
প্রায় ২১ বছর আগে ঈদগাহ মাঠের জায়গা বাড়ানোর যুক্তি এবং গাছ বিক্রি করে আর্থিক লাভের আশায় কিছু ব্যক্তি এই প্রাচীন বটগাছ কাটার উদ্যোগ নেন। তবে সেই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ান গ্রামের প্রবীণ মফিজ উদ্দিন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘এই গাছের মধ্যে আমারও ভাগ আছে। আমি আমার ভাগ বিক্রি করব না।’
ঈদগাহ মাঠ যেহেতু পুরো গ্রামের সম্পদ, তাই গাছটির মালিকানাও গ্রামের সবার—এই যুক্তিতেই তাঁর অবস্থানকে সমর্থন করেন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আবদুল লতিফ ও কৃষক আলী আফজাল খাঁ। তাঁদের দৃঢ় অবস্থানের ফলে গাছ কাটার উদ্যোগ আর সহজে এগোতে পারেনি।
পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বন বিভাগকে গাছটির মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি তাঁকে কম মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রভাবিত করারও চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং গাছটির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে অটল থাকেন।
সে সময় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং গাছ কাটার বিরোধিতা করেন। বন বিভাগ গাছটির মূল্য প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বেশি নির্ধারণ করে। পরে আরও দুইবার মূল্য নির্ধারণের আবেদন হলেও আগের নির্ধারিত মূল্যের নিচে আর কেউ নামেননি।
উচ্চ মূল্য এবং স্থানীয়দের দৃঢ় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত গাছ কাটার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বটগাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয়, বরং ময়েনপুর এলাকার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ প্রতিদিন এই প্রাচীন বটগাছ দেখতে সেখানে আসেন।
গাছ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছরের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক মফিজ উদ্দিন, আবদুল লতিফ ও আলী আফজাল খাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। বর্তমানে তাঁদের বয়স যথাক্রমে ৭৮, ৭০ ও ৭৫ বছর।
স্থানীয় শিক্ষক আবদুল লতিফ জানান, গাছ কাটার উদ্যোগের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই সূত্র ধরেই প্রশাসনের হস্তক্ষেপ সম্ভব হয়েছিল।
বর্তমানে বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. ইউসুফ আলী সেই সময়ের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, গাছটি সংরক্ষণের পক্ষে থাকা মানুষদের অবস্থান তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ সেই বটগাছ আর শুধু একটি গাছ নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবেশ সচেতনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যে গাছ একসময় কাটার পরিকল্পনা হয়েছিল, সেটিই এখন ময়েনপুরবাসীর পরিচয়ের অন্যতম অংশ।
সিএ/এমআর


