ইসলামের ইতিহাসে কুফা শহর শুধু রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং সুপরিকল্পিত নগরায়ণের একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবেও পরিচিত। দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত এই শহর পরবর্তী সময়ে ইসলামি খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল।
মাদায়েন যুদ্ধে পারসিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের পর ইরাক অঞ্চলে মুসলিম সেনাদের জন্য একটি উপযোগী কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। কাদেসিয়া ও মাদায়েন অঞ্চলের আবহাওয়া মুসলিম মুজাহিদদের জন্য অনুকূল না হওয়ায় সাহাবি সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে নতুন স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সালমান ফারসি ও হোজায়ফা (রা.)-এর মতো অভিজ্ঞ সাহাবিদের পরামর্শে হিরা ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী কাঁকরময় একটি অঞ্চলকে নতুন শহরের জন্য নির্বাচন করা হয়। আরবি ভাষায় কাঁকরময় ভূমিকে ‘কুফা’ বলা হয় বলেই শহরটির নামকরণ হয় কুফা।
ইতিহাসবিদদের মতে, শহরটির পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত আধুনিক। প্রধান সড়কগুলো ছিল প্রায় ৪০ হাত প্রশস্ত, ছোট রাস্তা ৩০ হাত এবং গলিপথগুলো কমপক্ষে ৭ হাত চওড়া রাখা হয়েছিল। প্রশস্ত সড়কগুলো শুধু যাতায়াতের সুবিধাই নিশ্চিত করেনি, বরং শহরের পরিবেশ ও বায়ু চলাচলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা হয়েছিল জামে মসজিদ। নগর পরিকল্পনার শুরুতেই মসজিদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এর পাশেই নির্মিত হয়েছিল বায়তুলমাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং প্রশাসনিক ভবন। রুজবা ফারিসি নামের একজন দক্ষ স্থপতি এই নির্মাণকাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
খলিফা ওমর (রা.) আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রেও কিছু নীতিমালা নির্ধারণ করেছিলেন। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ইটের বাড়ি নির্মাণের অনুমতি থাকলেও নির্দেশ ছিল ঘর যেন অতিরিক্ত উঁচু বা তিন কক্ষের বেশি না হয়। এতে নগরজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়েছিল।
প্রথমদিকে কুফায় মুসলিম মুজাহিদ ও সাধারণ মুসলমানরা বসবাস করলেও পরে সেখানে পারস্যের কিছু সেনাদলও বসবাসের অনুমতি পায়। ‘হামরায়ে দায়লাম’ নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী জিজিয়া প্রদানের মাধ্যমে শহরে বসবাস করত। একইভাবে আরব উপদ্বীপ থেকে আসা নাজরানের ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের জন্যও আলাদা মহল্লা গড়ে ওঠে।
৩৬ হিজরিতে ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) খেলাফতের রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন। সামরিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে কুফাকে তখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছিল। প্রায় পাঁচ বছর ইসলামি খেলাফতের কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে শহরটি।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষকদের মতে, কুফার পরিকল্পিত নগর কাঠামো ও নির্মাণশৈলী প্রমাণ করে যে খলিফা ওমর (রা.) নগর ব্যবস্থাপনা ও স্থাপত্য ভাবনায় কতটা দূরদর্শী ছিলেন। শহরটিতে একদিকে আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল, অন্যদিকে খোলা পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যও বজায় রাখা হয়েছিল।
সিএ/এমআর


