বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা দ্রুত বিস্তৃত হলেও এর সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৮ কোটি ৫৮ লাখ। পাশাপাশি ১ হাজারের বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় এসেছে। তবুও অন্তর্ভুক্তি, প্রবেশগম্যতা, গোপনীয়তা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বর্তমানে প্রযুক্তি শুধু যোগাযোগ বা সুবিধার মাধ্যম নয়, বরং রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার এবং ব্যবহারকারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংযোগ বাড়লেও সব নাগরিক সমানভাবে এর সুফল ভোগ করতে পারছে না। আয়, শিক্ষা, লিঙ্গ, ভাষা ও ডিজিটাল দক্ষতার মতো বিষয়গুলো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯৮.৯ শতাংশ পরিবারে মোবাইল ফোন থাকলেও কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ৯.১ শতাংশ পরিবারে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার ও মোবাইল মালিকানার হারও কম। এসব তথ্য প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরে।
ডিজিটাল সেবার বিস্তারের ফলে নাগরিক সুবিধা বাড়লেও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, নজরদারি ও অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের মতো বিষয় সামনে এসেছে। প্রযুক্তি যেমন সুবিধা দেয়, তেমনি ক্ষমতার বণ্টনও নির্ধারণ করে। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামো এখন নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইন্টারনেট ও টেক্সট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সেবা খাতে এর প্রভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে।
ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক সেবা এখনো পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হলেও তা সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি হলেও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখনো চ্যালেঞ্জ। তথ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি এই আলোচনাকে আরও জটিল করেছে। এটি তথ্যপ্রবাহ, শ্রমবাজার ও সামাজিক কাঠামোয় প্রভাব ফেলছে। বাংলা ভাষা, স্থানীয় জ্ঞান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো এতে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত না হলে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজিটাল জনপরিসরের বড় অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। এসব প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক লক্ষ্য মূলত ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখা, যা অনেক সময় বিভাজন ও ভ্রান্ত তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সক্ষমতা মানে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানা নয়; বরং নিজের তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা, নীতিগত বিষয় বোঝা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতা থাকা। এজন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন নাগরিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের জন্য করণীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রযুক্তিকে শুধু উন্নয়ন নয়, অধিকার ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। নীতিনির্ধারণে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সবশেষে বলা হচ্ছে, ডিজিটাল অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা নাগরিকের হাতে নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সিএ/এমআর


