Wednesday, January 21, 2026
17 C
Dhaka

অন্ধকারে আলোর দিশারি মুজাদ্দিদে আলফে সানি

সত্য যখন ম্লান হয়ে যায়, ন্যায় যখন পরাভূত হয়, তখন আকাশ নীরব থাকে না। মহান আল্লাহ তায়ালা সে সময় মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেন মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক, যিনি নবী করিম (সা.)–এর রেখে যাওয়া দ্বীনকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ এই উম্মতের জন্য প্রতি শতাব্দীর শুরুতে এমন একজনকে প্রেরণ করবেন, যিনি এই উম্মতের দ্বীনকে সংস্কার করবেন। (আবু দাউদ: ৪২৯১)

এই নবুয়তি ঘোষণারই বাস্তব প্রতিফলন ছিলেন ইমাম রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)। ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ে তিনি তাওহিদের প্রদীপ জ্বালিয়ে সমাজকে পথ দেখিয়েছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন মুঘল সম্রাট আকবর ভারতবর্ষে দ্বীনে ইলাহি নামের এক বিকৃত মতবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছিলেন, তখন শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) নির্ভীক কণ্ঠে তাওহিদের পক্ষে অবস্থান নেন।

মুঘল সম্রাট আকবর (১৫৫৬–১৬০৫ খ্রি.) একদিকে শক্তিশালী শাসক হিসেবে পরিচিত হলেও অন্যদিকে ধর্মীয় উদ্ভট চিন্তার জন্য ইতিহাসে সমালোচিত। তার রাজসভা ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় মতের আলোচনাকেন্দ্র, যেখানে হিন্দু, খ্রিষ্টান, জোরোয়াস্ত্রীয় ও মুসলিম পণ্ডিতরা অংশ নিতেন। শুরুতে এটি মুক্ত চিন্তার পরিবেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ধীরে ধীরে তা একটি বিকৃত মতাদর্শের জন্ম দেয়।

রাজপণ্ডিত আবুল ফজল ও ফয়েজির প্রভাবে আকবর দ্বীনে ইলাহি নামের একটি নতুন মতবাদ চালু করেন। রাজনৈতিক ঐক্যের অজুহাতে প্রতিষ্ঠিত এই মতবাদে নবীজি (সা.)–এর চূড়ান্ত নবুয়ত অস্বীকার, নামাজ, রোজা ও হজের মতো ফরজ ইবাদতকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা এবং সম্রাটকে আধ্যাত্মিক নেতার মর্যাদা দেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ইসলামি সমাজে ভয়াবহ বিভ্রান্তি ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

এ সময় অনেক আলেম ভয়ে কিংবা সুবিধাবাদের কারণে নীরবতা অবলম্বন করেন। এমন অন্ধকার মুহূর্তে এক তরুণ আলেম দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, যে ধর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর আনুগত্য নেই, সে ধর্ম আল্লাহর ধর্ম হতে পারে না। এই সাহসী আলেমই ছিলেন শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.), যিনি পরে মুজাদ্দিদে আলফে সানি নামে ইতিহাসে খ্যাত হন।

শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের সিরহিন্দ নগরে। তার পিতা শায়খ আব্দুল আহাদ ফারুকী (রহ.) ছিলেন নকশবন্দি তরিকার বিশিষ্ট সুফি। বংশগতভাবে তিনি দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর বংশধর।

শৈশবকাল থেকেই তিনি অসাধারণ মেধা ও জ্ঞানপ্রতিভার পরিচয় দেন। কোরআন ও হাদিসের পাশাপাশি ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও তাসাউফে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। দিল্লি, আগ্রা ও সামরকন্দের পণ্ডিতদের সঙ্গে তার যোগাযোগ তাকে পরিণত করে এক শক্তিশালী ইসলামি চিন্তাবিদে।

আকবরের ধর্মীয় নীতির ফলে মুসলিম সমাজে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়। মসজিদে নামাজ বন্ধ হয়ে যায়, রাজসভায় ইসলামবিরোধী মতবাদ ছড়াতে থাকে, এমনকি আল্লাহু আকবর ধ্বনির স্থলে জয় আকবর উচ্চারিত হতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) কলমকে অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি শুরু করেন তার ঐতিহাসিক মাকতুবাতে ইমাম রাব্বানী রচনার মাধ্যমে এক দাওয়াতি আন্দোলন। এসব চিঠি তিনি পাঠান শাসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আলেম ও সাধারণ মানুষের কাছে। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, নবীজি (সা.)–এর শরিয়তই মানবতার একমাত্র মুক্তির পথ এবং দ্বীনে ইলাহি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

তার যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও কোরআন-হাদিসভিত্তিক ব্যাখ্যা সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বীনে ইলাহি ত্যাগ করে ইসলামে ফিরে আসেন।

১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র জাহাঙ্গীর সিংহাসনে বসেন। প্রথমদিকে তিনি পিতার নীতি অনুসরণ করলেও দরবারি মহলের প্ররোচনায় শায়খ আহমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ ওঠে। এর ফলস্বরূপ ১৬১৮ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি করা হয়।

কারাবন্দি অবস্থাতেও তার দাওয়াত থেমে থাকেনি। বরং তার চরিত্র, আখলাক ও ঈমানি দৃঢ়তায় প্রভাবিত হয়ে অনেক কারারক্ষী ইসলাম গ্রহণ করেন। অবশেষে জাহাঙ্গীর নিজেই তার মহত্ত্ব উপলব্ধি করে তাকে মুক্তি দেন এবং সম্মানের সঙ্গে রাজসভায় স্থান দেন।

হিজরি এক হাজার বছর পূর্তির সময় পরিচালিত তার সংস্কার আন্দোলনের কারণেই তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বলা হয়। তিনি শরিয়ত ও তাসাউফের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করেন এবং ঘোষণা করেন, যে তাসাউফ শরিয়তবিহীন তা ভ্রান্ত, আর যে শরিয়ত তাসাউফবিহীন তা প্রাণহীন।

তার তাওহিদে শুহুদি মতবাদ ইসলামি দর্শনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তার চিন্তা ও দাওয়াত পরবর্তী সময়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.), সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.)সহ বহু সংস্কারকের মাধ্যমে বিকশিত হয়।

মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.) আমাদের শিক্ষা দেন, সত্যের পথে চলতে গেলে আপস নয়, ত্যাগের সাহস প্রয়োজন। তার জীবন আজও বিভ্রান্ত সময়ের মানুষের জন্য আলোর দিশারি হয়ে আছে।

সিএ/এসএ

spot_img

আরও পড়ুন

শাবান মাসেই হোক রমজানের প্রস্তুতি

রমজানুল মোবারক মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের...

ঢাবির খ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য ৯৩ শতাংশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৫–২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কলা, আইন ও সামাজিক...

নতুন অ্যালবাম নিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর পর ফিরছেন বালাম

দেশের জনপ্রিয় গায়ক বালাম দীর্ঘ ১৩ বছর পর নতুন...

১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের রি-ইস্যু নিলাম আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে

বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ১০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ...

দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ: ধর্ম উপদেষ্টা

দেশে দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ...

‘বোনাস ফসলে’ সরিষা, চাষির মুখে হাসি ও ভোজ্যতেলের সংকট কাটার আশা

দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলায় সরিষার চাষ দিন দিন বাড়ছে। পতিত...

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক...

রুপার বাজারেও নতুন রেকর্ড, দেশে আজ থেকে বিক্রি হবে যে দামে

স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির ধারাবাহিকতায় দেশের বাজারে আবারও বাড়ানো হয়েছে...

ভেজা চুলে বসা কেন বিপজ্জনক?

ছোটবেলা থেকে আমরা প্রায় সবাই শুনে এসেছি— “ভেজা চুল...

বয়কটের মুখে বেলজিয়ামে ‘ইসরাইলি’ রেস্তোরাঁ চেইন বন্ধ

বেলজিয়ামে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও বয়কটের চাপের মুখে নিজেদের...

সেই সিরিয়াল কিলার সম্রাটের আসল পরিচয় প্রকাশ, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

সাভারে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচিত সিরিয়াল...

প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্বে বাংলাদেশের ভালো ভাবমূর্তি রয়েছে: অর্থ উপদেষ্টা

প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি...

বাণিজ্য মেলায় ক্রেতাদের নজর কাড়ছে পাট পণ্য

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ক্রেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে...

দেব-শুভশ্রীর সিনেমায় অনির্বাণের চমক

কলকাতার টালিপাড়ায় ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্বের কারণে সম্প্রতি বেশ...
spot_img

আরও পড়ুন

শাবান মাসেই হোক রমজানের প্রস্তুতি

রমজানুল মোবারক মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক অনন্য মৌসুম। তবে এই মহিমান্বিত মাসের পূর্ণ ফজিলত অর্জন করতে হলে আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত...

ঢাবির খ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য ৯৩ শতাংশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৫–২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের (খ ইউনিট) স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে অংশ...

নতুন অ্যালবাম নিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর পর ফিরছেন বালাম

দেশের জনপ্রিয় গায়ক বালাম দীর্ঘ ১৩ বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে ভক্তদের মাঝে ফেরত এসেছেন। তার এই একক অ্যালবামের নাম ‘মাওলা’, যা জানা গেছে,...

১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের রি-ইস্যু নিলাম আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে

বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ১০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ডের রি-ইস্যু নিলাম আয়োজন করবে। নিলামটি প্রাইসভিত্তিক হবে। এ নিলামে ২০২৫ সালের ১৯...
spot_img