মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। কারণ সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন ছাড়া ইবাদত-বন্দেগি, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা সামাজিক কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়। ইসলাম তাই ব্যক্তিজীবনে এমন কিছু মৌলিক স্বাস্থ্যবিধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা অনুসরণ করলে ব্যক্তি যেমন সুস্থ থাকতে পারে, তেমনি একটি সুশৃঙ্খল জীবনও গড়ে তুলতে পারে।
ইসলামী শিক্ষার আলোকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শরীর, পোশাক, বাসস্থান এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখলে জীবাণুর বিস্তার কমে এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
হাদিসে বলা হয়েছে, ‘দশটি বিষয় মানুষের স্বভাবজাত (ফিতরাত)। ১. গোঁফ ছোট করা, ২. দাড়ি বৃদ্ধি করা, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, ৫. নখ কাটা, ৬. আঙুলের গিঁট ও ভাঁজে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করা, ৭. বগলের লোম উপড়ে ফেলা, ৮. নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণ করা, ৯. পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা এবং ১০. (বর্ণনাকারী বলেন) দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি; তবে সম্ভবত তা ছিল কুলি করা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১)
ইসলামে খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও হালাল ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের জন্য উপকারী ও পবিত্র খাদ্য হালাল করা হয়েছে এবং ক্ষতিকর ও অপবিত্র বস্তু হারাম করা হয়েছে। হালাল খাদ্য শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে এবং আত্মিক পবিত্রতাও বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
কোরআনে বলেছেন, ‘তাদের জন্য যাবতীয় সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর বস্তু হালাল ঘোষণা করেন এবং যাবতীয় ঘৃণ্য ও ক্ষতিকর বস্তু হারাম করে দেন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭)
ইসলাম মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ মদ ও মাদকদ্রব্য মানুষের শারীরিক সক্ষমতা নষ্ট করার পাশাপাশি মেধা, বিচারবোধ এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন এসব গ্রহণ করলে লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ অপবিত্র, শয়তানি কাজ। সুতরাং এসব পরিহার করো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৯০)
পরিমিত খাদ্যাভ্যাসকেও ইসলামে সুস্বাস্থ্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ শরীরের স্বাভাবিক হজমপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং নানা ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়ন্ত্রিতভাবে খাবার গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনীয় অতিভোজন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হাদিসে বলা হয়েছে, ‘উদর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্য ততটুকু খাদ্যই যথেষ্ট, যতটুকুতে তার পিঠ সোজা থাকে। আর যদি এর চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তবে সে যেন তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং অন্য আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩৪৯)
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামকেও ইসলাম মানবজীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্ককে পুনরায় কর্মক্ষম করে তোলে, রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। কোরআনে ঘুমকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯)
নবীজি (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার চক্ষুর হক বা অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৩)
ইসলামের এসব নির্দেশনা ব্যক্তি জীবনে অনুসরণ করলে সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন সম্ভব। একই সঙ্গে ইবাদত, কর্মজীবন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সিএ/এমআর


