মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ ওলিউদ্দিন আবু জাইদ আবদুর রহমান ইবনে খালদুনের জীবনের শেষ অধ্যায় কেটেছিল মিসরে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পেরিয়ে ১৩৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কায়রোতে আশ্রয় নেন। জীবনের শেষ প্রায় দুই দশক সেখানে কাটিয়ে তিনি তাঁর জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও বিচারকার্যের মাধ্যমে নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হন।
ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল–মুকাদ্দিমায় মিসরকে বিশ্বের উদ্যান এবং মানবজাতির মিলনস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মিসরীয়দের স্বভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, তাদের মধ্যে আনন্দময় মনোভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের স্বস্তিবোধ লক্ষ করা যায়। ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণের অংশ হিসেবেই এই পর্যবেক্ষণ স্থান পেয়েছিল।
কায়রোতে পৌঁছানোর পর মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন। আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরে তাঁকে মিসরের মালেকি ফিকহের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-মাদরাসাতুল ক্বমহিয়্যার প্রধান অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি খানকাহ বাইবার্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও পালন করেন।
তবে তাঁর কর্মজীবন শুধু সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মালেকি মাজহাবের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকালে আদালতের দুর্নীতি ও প্রভাবশালীদের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন তিনি। এই আপসহীন ভূমিকার কারণে প্রশাসনিক ও ধর্মীয় মহলের একটি অংশের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। এর ফল হিসেবে সাত বছরের মধ্যে তাঁকে একাধিকবার বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ এবং পুনর্বহাল করা হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও তাঁকে নানা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ১৩৮৯ সালে মামলুক আমির ইয়ালবুগা আল-নাসেরির নেতৃত্বে সুলতান বারকুকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংঘটিত হলে কায়রোর শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে ইবনে খালদুনকেও একটি ফতোয়ায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। পরে বারকুক পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এলে ইবনে খালদুন ব্যাখ্যা দেন যে, জীবন রক্ষার স্বার্থেই তিনি বাধ্য হয়ে ওই স্বাক্ষর করেছিলেন। এরপর সুলতান তাঁকে ক্ষমা করে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে দেন।
ইবনে খালদুনকে ঘিরে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো মিসরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মন্তব্য। তাঁর ছাত্র ইবনে হাজার আল-আসকালানির বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, তিনি বলতেন, ‘মিসরের রাজত্বের জন্য একমাত্র আশঙ্কার কারণ ইবনে উসমান।’ ইতিহাসবিদদের মতে, এই বক্তব্যে তিনি সমকালীন উসমানীয় সুলতান প্রথম বায়েজিদের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে ১৫১৭ সালে সুলতান সেলিম প্রথমের নেতৃত্বে উসমানীয়রা মিসর জয় করে, ফলে অনেকেই এই বক্তব্যকে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইবনে খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারা পরবর্তী প্রজন্মের ইতিহাসবিদদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ঐতিহাসিক মাকরিজি তাঁর আল–মুকাদ্দিমাকে অনন্য গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনে তাগরিবার্দি ও ইমাম সুয়ুতিসহ অনেক গবেষক তাঁর ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
তবে আধুনিক যুগে তাঁকে ঘিরে বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। মিসরের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ তাহা হোসাইন তাঁর গবেষণায় ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানকে উচ্চ মূল্যায়ন করলেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেন। পরে অধ্যাপক মাহমুদ ইসমাইল দাবি করেন, ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানের ধারণাগুলোর উৎস আরও প্রাচীন একটি চিন্তাধারা। তবে এই মতামত ইতিহাসবিদদের মূলধারায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং এটি এখনো বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেই বিবেচিত হয়।
সিএ/এমআর


