বাংলাদেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাঁতার না জানা এবং পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব এই মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা বাড়ে।
ইউনিসেফের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভের তথ্য বলছে, দেশে অপঘাতে মারা যাওয়া প্রায় ৩০ হাজার শিশুর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি প্রাণ হারায় পানিতে ডুবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী, খাল, বিল, পুকুর ও ডোবার উপস্থিতি বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে স্বাভাবিক বাস্তবতা। পাশাপাশি প্রতিবছর বন্যার কারণে অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। ফলে শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জহুরুল হক সাগর বলেন, ‘সমাজ ও অভিভাবকদের অসচেতনতাই এই মৃত্যুর মুখ্য কারণ। গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ শিশু পানিতে পড়ে যখন মায়েরা দুপুরের রান্না বা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই সুযোগে শিশুরা আপন মনে খেলতে খেলতে জলাধারের কাছে চলে যায় এবং দুর্ঘটনা ঘটে।’
তিনি আরও জানান, ‘সাঁতার শেখার উত্তম সময় হলো শিশুকাল। ৫ বছর বয়স থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানো শুরু করা উচিত। শহর ও গ্রামের সকল বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে সাঁতার শেখানো।’
শরীরচর্চা শিক্ষক শেখ মুহাম্মদ নূরে আলমের মতে, ‘সাঁতার একটি উত্তম ব্যায়াম। সাঁতার জানা মানুষ নিজ জীবন সুরক্ষাসহ পানিতে ডুবে যাওয়া অপরকেও বাঁচাতে পারে। সকল শিশুকে ৫ বছর বয়স থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সাঁতার শেখানোই এই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম উপায়।’
২০০৫ সাল থেকে ইউনিসেফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার শিশুকে সাঁতার শিখিয়েছে।
অস্ট্রেলীয় সাঁতার প্রশিক্ষক জেমস বলেন, ‘আমরা যদি একটি শিশুকে মাত্র ৯০ সেকেন্ড সাঁতার কাটা বা পানিতে ভেসে থাকা শেখাতে পারি, তবেই তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব।’
ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান ব্রিথ লোকেটেলি-রসি জানান, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মাইকেল ব্লুমবার্গ ফাউন্ডেশন ৭৭ কোটি টাকার সহায়তা দিচ্ছে। দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮০ হাজার শিশুর জন্য সাঁতার প্রশিক্ষণ ও তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুল পর্যায়ে সাঁতার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সূত্র: বাসস
সিএ/এমআর


