Thursday, July 9, 2026
25.5 C
Dhaka

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাইলে সহজেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আন্দোলনের অবসান ঘটাতে পারতেন। কিন্তু সে পথ না বেছে নিয়ে তিনি অবজ্ঞা ও দমননীতির আশ্রয় নেন। এর পরিণতিতে আন্দোলনটি ইতিহাসের নজিরবিহীন নৃশংসতার দিকে ধাবিত হয়—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব মন্তব্য উঠে এসেছে। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছর ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। ৫৭ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে ৪৫৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কীভাবে দমন-পীড়ন ও হত্যার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে।

রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং আরেকটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশে থাকা তাঁদের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া মামলার সাক্ষী থেকে রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকরের নির্দেশও উল্লেখ করা হয়।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পন্থায় মীমাংসায় পৌঁছানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল। যে কোটা ব্যবস্থা শেখ হাসিনা আগেই একবার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছিলেন, সেটি একই ইস্যুতে আবার কেন পুনরুজ্জীবিত হলো—এই প্রশ্নও তোলা হয়েছে রায়ে।

রায়ে আরও বলা হয়, আন্দোলনের সময় বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছে, তা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে প্রদর্শিত ভিডিওতে হতাহত আন্দোলনকারীদের আর্তনাদ এবং মাথার খুলি, চোখ, নাক, হাত-পা হারানো ভুক্তভোগী সাক্ষীদের দৃশ্য দেখে কোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ট্রাইব্যুনালের মতে, এ ধরনের নৃশংসতা যে কোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন এবং ন্যায়বিচারকে ব্যর্থ হতে দেওয়া উচিত নয়।

রায়ে সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগের আওতায় মোট ছয়টি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে তিনটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে শেখ হাসিনার দেওয়া সুপরিকল্পিত উস্কানিমূলক বক্তব্য। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ‘ফাঁসি দেওয়ার’ সরাসরি উস্কানি ও নির্দেশের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত। রায়ে বলা হয়েছে, অধস্তনদের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আসামিরা কোনো ধরনের বাধা দেননি। এসব নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগেও তিনটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। এতে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপের তথ্য উঠে এসেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব কথোপকথনে ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

এই নির্দেশনার ফল হিসেবে ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জন আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় আরও ছয়জনকে হত্যার পর তাঁদের মরদেহে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে। এসব অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল একটি নজিরবিহীন নির্দেশনাও দিয়েছেন। দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামে দেশে থাকা সব স্থাবর সম্পত্তি যেমন জমি ও বাড়ি এবং অস্থাবর সম্পত্তি যেমন ব্যাংক ব্যালেন্স ও শেয়ার রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা অর্থ ও সম্পদ যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে সরকারকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায় ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিরীহ জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধের বিচারিক দলিল হিসেবে এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকবে।

সিএ/এএ

spot_img

আরও পড়ুন

এআই কি সত্যিই চাকরি কমাচ্ছে, নাকি তৈরি করছে নতুন কর্মসংস্থান?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে একটি...

এআই প্রতিযোগিতায় নতুন গতি, নিজেদের মডেল নিয়ে এগিয়ে আসছে এশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান...

উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত

উচ্চ কোলেস্টেরল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। রক্তে...

ট্রাম্পের মিম কয়েনে বিনিয়োগকারীদের বড় লোকসান, ক্ষতি ৩৮০ কোটি ডলারের বেশি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে চালু হওয়া মিম কয়েনে...

আপনার পছন্দ অনুযায়ী কথা বলবে অ্যাপলের সিরি, আসছে নতুন নিয়ন্ত্রণ সুবিধা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সহকারী সিরিকে আরও স্বাভাবিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং...

খাওয়ার পর পেটব্যথা কেন হয়, কোন লক্ষণ কী সমস্যার ইঙ্গিত দেয়

খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা শুরু...

গুগলের নতুন পিক্সেল ১১ সিরিজ উন্মোচন ১২ আগস্ট, কী কী পরিবর্তন আসতে পারে

নতুন প্রজন্মের পিক্সেল স্মার্টফোন উন্মোচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে...

নরওয়েতে দ্রুত বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা, কমছে চার্চের সদস্য

ইউরোপের দেশ নরওয়েতে ধর্মীয় জনসংখ্যার চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা...

সুইডেনে পেশাজীবী মুসলিমদের নতুন বাস্তবতা: সুযোগের পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক চ্যালেঞ্জ

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত সোডারটেলিয়া শহরে গত এক...

প্যারাগুয়েতে মুসলিমদের জীবনযাপন: ছোট একটি সম্প্রদায়ের ধর্মচর্চা, ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই কম হলেও...

পরকালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন ৩ উপায়ে

পৃথিবীর জীবনে মানুষ নানা পরিকল্পনা করলেও একটি সত্য থেকে...

যে কৌশলে মিসর বিজয় করেছিলেন সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)

মুসলিম ইতিহাসে সাহস, কূটনৈতিক দক্ষতা ও রণকৌশলের জন্য বিশেষভাবে...

তীব্র তাপপ্রবাহে সবার জন্য খুলে দেওয়া হলো ফ্রান্সের কয়েকটি মসজিদ

তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ফ্রান্সে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে কয়েকটি মসজিদের...

নরওয়ের উত্তরে মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে আল-রহমা ও আন-নূর মসজিদ

উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত নরওয়ের ছোট শহর ত্রোমসোতে গড়ে...
spot_img

আরও পড়ুন

এআই কি সত্যিই চাকরি কমাচ্ছে, নাকি তৈরি করছে নতুন কর্মসংস্থান?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—এআই কি মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে? বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর এ...

এআই প্রতিযোগিতায় নতুন গতি, নিজেদের মডেল নিয়ে এগিয়ে আসছে এশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন উদ্ভাবন নিয়ে সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের উন্নত মডেলের ওপর সরকারি বিধিনিষেধ আরোপের...

উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত

উচ্চ কোলেস্টেরল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা ধমনীর ভেতরে জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।...

ট্রাম্পের মিম কয়েনে বিনিয়োগকারীদের বড় লোকসান, ক্ষতি ৩৮০ কোটি ডলারের বেশি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে চালু হওয়া মিম কয়েনে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ১০ লাখ বিনিয়োগকারী। একটি ক্রিপ্টো বিশ্লেষক...
spot_img