পৃথিবীর জীবনে মানুষ নানা পরিকল্পনা করলেও একটি সত্য থেকে কেউই মুক্ত নয়—মৃত্যু। ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি অনন্ত জীবনের সূচনা। তাই একজন মুমিনের জন্য দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সবাই তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন, মৃত্যু একসময় তাকে স্পর্শ করবেই—সেটি সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও হোক না কেন। ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, জীবন ও মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা, যার মাধ্যমে তার আমল মূল্যায়িত হবে।
সূরা মুলকে আল্লাহ বলেন, তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, যাতে পরীক্ষা করা যায়—কে সবচেয়ে উত্তম আমল করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পার্থিব জীবনের প্রতিটি কাজেরই হিসাব রয়েছে এবং সেই হিসাবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত পরিণতি।
সাধারণত মানুষ কয়েক দিনের বিদেশ সফরের জন্যও দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে, নানা পরিকল্পনা করে তবেই যাত্রা শুরু করে। অথচ যে সফর একবার শুরু হলে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই, সেই পরকালের যাত্রার জন্য কতটা প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে—এ প্রশ্ন প্রত্যেক মানুষের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না।
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, দুনিয়ার জীবন সাময়িক হলেও পরকালের জীবন চিরস্থায়ী। জান্নাতের পুরস্কার কিংবা জাহান্নামের শাস্তি—দুটিই হবে অনন্তকালব্যাপী। তাই জীবিত অবস্থাতেই নেক আমল বৃদ্ধি এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হাদিস ও ইসলামী আলোচনায় কিয়ামতের দিনকে অনুতাপের দিন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিন যদি কোনো ব্যক্তি সামান্য একটি নেক আমলের অভাবে সফলতা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তার আফসোসের শেষ থাকবে না। তাই সময় থাকতে নিজের আমল সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন আলেমরা।
তবে একসঙ্গে অতিরিক্ত ইবাদত বা নেক কাজের চাপ নিয়ে পরে ক্লান্ত হয়ে পড়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে ধারাবাহিকভাবে নিজেকে গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তারা তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা এবং নামাজে খুশু-খুজু বা একাগ্রতা অর্জনের চেষ্টা করা। কোরআনে সফল মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে নামাজে বিনয় ও মনোযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে অনেক পরিবর্তনের চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে খারাপ অভ্যাস দূর করা। একটি নেতিবাচক অভ্যাসের পরিবর্তে একটি ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা মানুষের আত্মশুদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন কৃপণতার পরিবর্তে দানশীলতা কিংবা রাগের পরিবর্তে ধৈর্য চর্চা করা।
তৃতীয়ত, সৎ ও নেককার মানুষের সান্নিধ্যে থাকা। কারণ মানুষের চরিত্র ও জীবনযাপনে বন্ধু ও পরিবেশের প্রভাব গভীর। ভালো মানুষের সাহচর্য মানুষকে নেক কাজের প্রতি উৎসাহিত করে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, একজন মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা গ্রহণ করা এবং তিনি যা অপছন্দ করেন তা থেকে বিরত থাকাই ঈমানের ভিত্তি। এই ভালোবাসা গড়ে ওঠে আশা ও ভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে।
প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইবনুল কাইয়িম ঈমানকে একটি পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাখির মাথা হলো ভালোবাসা এবং দুই ডানা হলো আশা ও ভয়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে যেমন পাখি উড়তে পারে না, তেমনি একজন মুমিনও সঠিক পথে অটল থাকতে পারে না।
শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, আল্লাহর ভালোবাসাই মানুষের প্রকৃত জীবন। এই ভালোবাসা মানুষকে অন্তরের অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং জান্নাতের পথে পরিচালিত করে।
পরকালের সফলতার জন্য তাই নিয়মিত ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, সৎ সঙ্গ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী চিন্তাবিদরা।
সিএ/এমআর


