মুসলিম ইতিহাসে সাহস, কূটনৈতিক দক্ষতা ও রণকৌশলের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয় সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)। মক্কার বনু সাহম গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সাহাবি পরবর্তীতে ইসলামের অন্যতম সফল সেনাপতি ও মিসর বিজয়ের নায়ক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
ধনী ব্যবসায়ী আস ইবন ওয়াইলের সন্তান আমর ইবনুল আস (রা.) শৈশব থেকেই বাগ্মিতা, নেতৃত্ব ও যুদ্ধকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেন। অশ্বারোহণ, মরুভূমির কঠিন পরিবেশে চলাফেরা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে সমসাময়িক আরবদের মধ্যে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। নানা দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার বিস্তৃত জ্ঞান পরবর্তী সময়ে সামরিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসলাম গ্রহণের আগে কুরাইশরা তাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত দূত হিসেবে ব্যবহার করত। এ কারণেই আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতকারী মুসলমানদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার ওপর। সঙ্গে ছিলেন উমারা ইবন ওয়ালিদ।
আবিসিনিয়ার ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজ্জাশির সমর্থন আদায়ে কুরাইশদের পক্ষ থেকে মূল্যবান উপঢৌকন নিয়ে রাজদরবারে হাজির হন তিনি। এমনকি দরবারের ধর্মীয় নেতাদেরও নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুসলমানদের প্রতিনিধি জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) ইসলামের বার্তা এমনভাবে তুলে ধরেন যে নাজ্জাশি ও উপস্থিত পাদ্রিরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এরপর নাজ্জাশি মুসলমানদের কুরাইশদের হাতে তুলে দিতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান।
পরদিন আমর (রা.) নতুন কৌশল অবলম্বন করে নাজ্জাশিকে জানান, মুসলমানরা ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর বান্দা বলে। জবাবে জাফর (রা.) ইসলামের অবস্থান ব্যাখ্যা করলে নাজ্জাশি বলেন, তাদের বক্তব্যই সত্যের কাছাকাছি। ফলে আমরের প্রথম বড় কূটনৈতিক মিশন ব্যর্থ হয়।
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর আবার আবিসিনিয়ায় গিয়ে আমরের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দূতকে হত্যার প্রস্তাব দেওয়ায় নাজ্জাশি তীব্রভাবে তাকে ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন, যাঁর কাছে জিবরাইল (আ.) আসেন, তাঁর দূতের বিরুদ্ধে এমন কথা বলা যায় না। এই ঘটনার পর আমর সত্য উপলব্ধি করেন এবং নাজ্জাশির হাত ধরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
মদিনায় যাওয়ার পথে তার সঙ্গে খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা.) ও উসমান ইবন আবি তালহার সাক্ষাৎ হয়। পরে তিনজনই মহানবী (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ইসলাম গ্রহণে রাসুলুল্লাহ (সা.) আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর আমর ইবনুল আস (রা.) দ্রুত মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিতে পরিণত হন। ওমানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, শাম অঞ্চলের যুদ্ধ, ফিলিস্তিন বিজয় এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব মিসর বিজয়। খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি মিসর অভিমুখে অভিযান শুরু করেন। আল-আরিশ, আল-ফারমা ও উম্মে দনিন জয় করার পর বাবিলন দুর্গ অবরোধ করেন। পরে খলিফা ওমর (রা.) আরও চার হাজার সৈন্য পাঠান, যাদের মধ্যে জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) ও উবাদা ইবন সামিত (রা.)-এর মতো সাহাবিরা ছিলেন। দীর্ঘ অবরোধের পর রোমানদের প্রতিরোধ ভেঙে মিসর মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিজয়ের পর তিনি ফুস্তাত নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং আফ্রিকার প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে আমর ইবনুল আস’ নির্মাণ করেন। পাশাপাশি নীলনদ ও লোহিত সাগরের মধ্যকার প্রাচীন খাল পুনরুদ্ধার করে বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। রোমান আমলের কঠোর করব্যবস্থা শিথিল করে কপ্টিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেন।
খলিফা উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর সিফফিনের যুদ্ধে তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষে অবস্থান নেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি বর্শার ডগায় কোরআন তুলে ধরে যুদ্ধবিরতি ও সালিশির আহ্বান জানান। পরে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। ইতিহাসে এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও বহু নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় রক্তপাত বন্ধ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জীবনের শেষভাগে আবারও মিসরের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আমর ইবনুল আস (রা.)। মৃত্যুশয্যায় তিনি আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নিজের অপূর্ণতার কথা স্বীকার করেন।
পরবর্তীতে কায়রোর মোকাত্তাম পাহাড়ের পাদদেশে তাকে দাফন করা হয়। সামরিক নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তিনি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে আজও স্মরণীয়।
সিএ/এমআর


