বিশ্বকাপ কিংবা আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় কোনো ম্যাচে শেষ বাঁশি বাজতেই শুরু হয় উল্লাসের বিস্ফোরণ। গ্যালারিতে দর্শকদের উচ্ছ্বাস, মাঠজুড়ে খেলোয়াড়দের আবেগ আর ক্যামেরার ঝলকানিতে তৈরি হয় স্মরণীয় সব মুহূর্ত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উদযাপনের ভিড়ে আরও একটি দৃশ্য বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। অনেক মুসলিম ফুটবলার জয় বা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের পর মাঠের এক কোণে গিয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ছেন। এই দৃশ্যকে অনেকেই কেবল উদযাপন নয়, বরং বিশ্বাস, বিনয় ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
আগে যেখানে গোল উদযাপন বলতে দৌড়ে গ্যালারির সামনে যাওয়া, কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে স্লাইড করা কিংবা সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাসই বেশি দেখা যেত, এখন অনেক মুসলিম ফুটবলার আবেগঘন মুহূর্তেও শান্তভাবে সিজদা করেন। পেশাদার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জনের মুহূর্তেও তারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে অগ্রাধিকার দেন।
ধর্মীয় এই অনুশীলন ধীরে ধীরে ফুটবলের পরিচিত এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব শুধু মাঠের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের মধ্যেও এটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়ে ওঠা তরুণ মুসলিমদের কাছে এই দৃশ্য আত্মপরিচয় ও বিশ্বাসের প্রকাশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই সামাজিক পরিবেশের কারণে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশে দ্বিধায় ভুগেছেন। কিন্তু বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকাশ্যে সিজদা করার মাধ্যমে দেখিয়ে দিচ্ছেন, পেশাগত সাফল্য এবং ধর্মীয় পরিচয় একসঙ্গে ধারণ করা সম্ভব।
ফলে অনেক তরুণের কাছে এই দৃশ্য আত্মবিশ্বাসের উৎস হয়ে উঠছে। তারা উপলব্ধি করছেন, বিশ্বমঞ্চে সফল হতে নিজের ধর্মীয় মূল্যবোধ বা পরিচয় বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
সিজদার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনয়। আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনে ব্যক্তিগত অর্জন, রেকর্ড এবং তারকাখ্যাতি বড় করে দেখা হলেও সিজদা সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক গৌরবের বিপরীতে কৃতজ্ঞতা ও নম্রতার বার্তা বহন করে। একজন খেলোয়াড় যখন কপাল মাটিতে রাখেন, তখন তিনি প্রতীকীভাবে স্বীকার করেন যে, সাফল্যের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাই নয়, মহান সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহও রয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সূরা হজের একটি আয়াতে বলা হয়েছে, হে ইমানদারগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো, তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করো এবং সৎ কাজ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।
এই শিক্ষার আলোকে অনেক খেলোয়াড় বিশ্বাস করেন, প্রকৃত সাফল্য অহংকারে নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের মধ্যেই নিহিত।
ফুটবলপ্রেমী হোন বা না হোন, মাঠে ফুটবলারদের সিজদার দৃশ্য অনেকের কাছেই একটি মানবিক ও আধ্যাত্মিক বার্তা বহন করে। দ্রুতগতির প্রতিযোগিতাময় জীবনের মধ্যেও এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের মুহূর্তেও বিনয়ী থাকা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
সিএ/এমআর
সূত্র: হালাল ট্রিপ


