সুস্থ জীবনযাপনের অন্যতম সহজ এবং কার্যকর ব্যায়াম হলো হাঁটা। নিয়মিত হাঁটলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে, শরীরের অতিরিক্ত মেদ নিয়ন্ত্রণে থাকে, মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং সামগ্রিকভাবে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁটার সময় কিছু সাধারণ ভুল দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে উপকারের পরিবর্তে পেশি, জয়েন্ট এবং মেরুদণ্ডে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
হাঁটার সময় সবচেয়ে প্রচলিত ভুলগুলোর একটি হলো অনুপযুক্ত জুতা ব্যবহার। অনেকেই সাধারণ স্যান্ডেল, চটি, হাই হিল কিংবা শক্ত ধরনের খেলাধুলার জুতা পরে হাঁটেন। এতে পায়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হয় এবং ফোসকা, ব্যথা কিংবা গোড়ালির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, হাঁটার জন্য হালকা, নরম কুশনযুক্ত, বাতাস চলাচল করতে পারে এবং আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা উচিত। বিকেল বা সন্ধ্যায় জুতা কিনলে পায়ের প্রকৃত মাপ অনুযায়ী নির্বাচন করা সহজ হয়।
হাঁটার সময় শরীরের ভঙ্গিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মোবাইল ফোন দেখতে দেখতে মাথা নিচু করে হাঁটেন অথবা শরীর পেছনের দিকে হেলিয়ে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলেন। এতে মেরুদণ্ড, ঘাড় এবং কোমরে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁটার সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে এবং ১০ থেকে ৩০ ফুট দূরের দিকে দৃষ্টি রেখে হাঁটা উচিত। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর গভীর শ্বাস নেওয়া কাঁধকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে সহায়তা করে।
আরেকটি সাধারণ ভুল হলো অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় বড় পা ফেলা কিংবা হাত অতিরিক্ত দোলানো। এতে হাঁটার গতি বাড়ার পরিবর্তে কমে যেতে পারে এবং শরীরের ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
হাঁটার সময় কনুই প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে শরীরের পাশে স্বাভাবিকভাবে হাত নাড়ানো এবং গোড়ালি থেকে শুরু করে পায়ের আঙুল পর্যন্ত ধাপে ধাপে ভর দিয়ে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেকেই হাঁটা শুরু করার আগে ওয়ার্মআপ করেন না এবং শেষ করার পর হঠাৎ বসে পড়েন। এতে হার্ট ও পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই প্রথম পাঁচ মিনিট ধীরগতিতে হাঁটা এবং শেষের পাঁচ থেকে দশ মিনিট ধীরে গতি কমিয়ে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এরপর পায়ের কাফ মাসল, হ্যামস্ট্রিং ও হিপসের হালকা স্ট্রেচিং করলে পেশি দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
হাঁটার সময় হাতে ভারী ওজন বহন করা বা কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংক পান করাও উপকারী নয়। সাধারণ হাঁটার জন্য অতিরিক্ত ওজন বহনের প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত পানি পান করাই সবচেয়ে ভালো অভ্যাস। দীর্ঘ সময় হাঁটলে নির্দিষ্ট বিরতিতে পানি পান করা উচিত।
প্রতিদিন একই রুটে একই গতিতে হাঁটলে মানসিক একঘেয়েমি তৈরি হতে পারে এবং শরীরও একই ধরনের ব্যায়ামের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই মাঝেমধ্যে হাঁটার পথ পরিবর্তন, পার্ক বা সবুজ পরিবেশে হাঁটা কিংবা ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং করলে হাঁটার কার্যকারিতা বাড়ে।
নিরাপত্তার বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি। কানে উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে হাঁটলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তাই এমনভাবে হেডফোন ব্যবহার করা উচিত যাতে বাইরের শব্দ শোনা যায়। প্রয়োজন হলে হাঁটা থামিয়ে মোবাইল ব্যবহার করাই নিরাপদ।
ভোর কিংবা রাতে হাঁটার সময় উজ্জ্বল বা প্রতিফলকযুক্ত পোশাক পরা, আরামদায়ক পোশাক ব্যবহার, প্রয়োজনে সানস্ক্রিন ও সানগ্লাস ব্যবহার এবং একা হাঁটতে অস্বস্তি হলে বন্ধু বা পরিবারের কাউকে সঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি প্রতিদিনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ফিটনেস অ্যাপ বা পেডোমিটার ব্যবহার করলে হাঁটার প্রতি আগ্রহও বজায় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য কিছু নিয়ম মেনে হাঁটলে এই সহজ ব্যায়াম থেকেই দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসুবিধা পাওয়া সম্ভব।
সিএ/এমআর


