বর্ষার মৌসুমে মেঘ আর বৃষ্টির কারণে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু মেঘ সরে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হলে জুন মাসের শেষ দিনগুলোতে আকাশপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে একাধিক আকর্ষণীয় মহাজাগতিক দৃশ্য। বছরের দীর্ঘতম দিন থেকে শুরু করে গ্রহের অবস্থান পরিবর্তন, চাঁদের সঙ্গে শনি ও মঙ্গলের নিকটবর্তী অবস্থান এবং বিখ্যাত সামার ট্রায়াঙ্গলের আবির্ভাব—সব মিলিয়ে জুনের শেষার্ধ হয়ে উঠতে পারে জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য বিশেষ সময়।
২১ জুন উত্তর গোলার্ধে পালিত হয় বছরের দীর্ঘতম দিন, যা সামার সলসটিস নামে পরিচিত। এ সময় সূর্য তার বার্ষিক গতিপথে আকাশের সবচেয়ে উত্তরাংশে অবস্থান করে এবং কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর প্রায় লম্বভাবে আলো ফেলে। বাংলাদেশেও এ দিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় থাকে বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি। এর পর থেকে ধীরে ধীরে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে এবং রাত বড় হতে শুরু করে।
জুনের শেষ দিকে সন্ধ্যার পশ্চিম আকাশে গ্রহগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যাবে। মাসের শুরুতে কাছাকাছি অবস্থান করা শুক্র ও বৃহস্পতির দূরত্ব ক্রমেই বাড়বে। শুক্র গ্রহ পশ্চিম আকাশে আরও উজ্জ্বল ও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। অন্যদিকে বৃহস্পতি সূর্যের কাছাকাছি চলে যাওয়ায় সূর্যাস্তের পর খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা যাবে এবং দ্রুত গোধূলির আলোয় মিলিয়ে যাবে।
একই সময়ে বুধ গ্রহও ধীরে ধীরে দিগন্তের নিচের দিকে নেমে যাবে। মাসের শেষ সপ্তাহে সূর্যের তীব্র আলোর কারণে এটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়বে।
ভোরের আকাশেও দেখা মিলবে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দৃশ্যের। জুনের শেষ সপ্তাহে ক্ষীয়মাণ চাঁদকে শনি ও মঙ্গলের কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা যাবে। ২৭ জুন ভোরের দিকে দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে চাঁদের পাশে শনিকে দেখা যেতে পারে। টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে শনির বলয় এবং চাঁদের পৃষ্ঠের গর্ত একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এর দুই দিন পর, ২৯ জুন ভোরে পূর্ব আকাশে মঙ্গলের লালচে আভার পাশে অবস্থান করবে বাঁকা চাঁদ। সূর্যোদয়ের আগে খালি চোখেই এই দৃশ্য উপভোগ করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জুনের শেষ ভাগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হতে পারে সামার ট্রায়াঙ্গল। রাত ১০টার পর আকাশ পরিষ্কার থাকলে পূর্ব আকাশ থেকে মাথার ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল কাল্পনিক ত্রিভুজ দেখা যাবে। এটি তিনটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিয়ে গঠিত।
লাইরা নক্ষত্রপুঞ্জের ভেগা, অ্যাকুইলা নক্ষত্রপুঞ্জের আলটায়ার এবং সাইগনাস নক্ষত্রপুঞ্জের ডেনেব মিলে তৈরি করে এই বিখ্যাত ত্রিভুজ। তিনটি নক্ষত্রই এত উজ্জ্বল যে নগর এলাকার আকাশ থেকেও সহজে শনাক্ত করা সম্ভব।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, সামার ট্রায়াঙ্গল উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম ও বর্ষার আগমনের অন্যতম পরিচিত মহাজাগতিক চিহ্ন। প্রতিবছর এ সময় আকাশে এর উপস্থিতি রাতের আকাশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এ ছাড়া জুনের শেষ দিকে চাঁদ ধীরে ধীরে অমাবস্যার দিকে অগ্রসর হবে। ফলে গভীর রাতে চাঁদের আলো কমে যাওয়ায় আকাশ আরও অন্ধকার থাকবে, যা নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টির পরপরই আকাশ পরিষ্কার হলে বাতাসের ধুলিকণা অনেকাংশে ধুয়ে যায়। ফলে গ্রহ ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য বছরের অন্যতম সেরা পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই আকাশ পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ পেলেই ছাদ বা খোলা স্থান থেকে এসব মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করা যেতে পারে।
সূত্র: স্কাইম্যাপ, টাইম অ্যান্ড ডেট, স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ, অ্যাস্ট্রোনমি ডটকম, সাইটেক
সিএ/এমআর


