টানা দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার হতাশা কাটিয়ে আবারও নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে জার্মানি। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই প্রত্যাবর্তনের গল্পে সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন ডেনিজ উন্দাভ। যে ফুটবলারের জীবনের পথচলা সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান আর অপেক্ষার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে, তিনিই এখন জার্মানির নতুন ভরসা।
বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে উন্দাভের জোড়া গোলে ২–১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় জার্মানি। সেই জয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় নকআউট পর্বের টিকিট। আর ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এই স্ট্রাইকার।
তবে কয়েক মাস আগেও চিত্রটা ছিল ভিন্ন। বিশ্বকাপের দলে তার জায়গা নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা। এমনকি জাতীয় দলের কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিরোধেও জড়াতে হয়েছিল তাকে।
এক ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে শেষ সময়ে গোল করার পর উন্দাভ গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আমি শুরুর একাদশে খেলার যোগ্যতা রাখি।’ সেই মন্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে নাগেলসমান বলেছিলেন, ‘শুরু থেকে খেললে হয়তো ওই গোলটিই করতে পারতেন না উন্দাভ।’
সমালোচনা বা সংশয়ের জবাব কথায় নয়, মাঠেই দিয়েছেন উন্দাভ। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন তিনি। ম্যাচ শেষে নাগেলসমানও ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী ম্যাচে শুরু থেকেই দেখা যেতে পারে এই ফরোয়ার্ডকে।
জার্মান কোচ বলেন, ‘কেন আমি ওর ছন্দ নষ্ট করব? দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দুই ম্যাচেই গোল করেছে। তবে (পরের ম্যাচে) ওকে শুরু থেকেই খেলানো হতে পারে।’
উন্দাভের বর্তমান সাফল্যের পেছনের গল্পটা সহজ ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভের্ডার ব্রেমেনের একাডেমি থেকে বাদ পড়তে হয়েছিল তাকে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, তার শারীরিক গঠন বড় পর্যায়ের ফুটবলের জন্য যথেষ্ট নয়।
এই প্রত্যাখ্যান তাকে থামাতে পারেনি। বরং নতুন করে নিজেকে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৭ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে দূরে গিয়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসেতে যোগ দেন। কিন্তু ফুটবল থেকে পাওয়া আয় ছিল খুবই সীমিত—সপ্তাহে প্রায় ১২০ পাউন্ড।
জীবন চালাতে তাই মাঠের বাইরেও সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। ফুটবলের পাশাপাশি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন উন্দাভ। দিনের বড় অংশ কাটত কাজ আর অনুশীলনের মধ্যে।
বেলজিয়ান গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা স্মরণ করে উন্দাভ বলেছিলেন, ‘ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠতাম। সরাসরি চলে যেতাম কারখানায়, সেখানে ৮ ঘণ্টা কাজ শেষ করে যেতাম অনুশীলনে। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৮টা বেজে যেত। পরদিন আবার একই রুটিন। বেঁচে থাকার জন্যই আমাকে কাজটা করতে হয়েছে। শুধু ফুটবল থেকে পাওয়া টাকায় তখন চলা সম্ভব ছিল না।’
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০২০ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়াজে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান উন্দাভ। সেখান থেকেই তার ক্যারিয়ারে মোড় ঘুরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। আর এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির জার্সিতে হয়ে উঠেছেন দলের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক।
সিএ/এমই


