যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণের পরও ইরান দ্রুতগতিতে তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বহু সুড়ঙ্গ ও স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করে আবারও কার্যকর করেছে তেহরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের বড় অংশই পাথরের গভীরে নির্মিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত ছিল। ফলে হামলার পরও দেশটির মূল ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ইরান বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক এবং অন্যান্য সাধারণ নির্মাণযান ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গ ও প্রবেশপথ দ্রুত পুনরুদ্ধার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সুড়ঙ্গের মুখ ধ্বংস করলেই ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার অকার্যকর করা সম্ভব নয়।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার বলেন, “মার্কিন সামরিক বাহিনী কৌশলগত সাফল্য অর্জনে বেশ দক্ষ এবং ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে সুড়ঙ্গের নিচে চাপা দিয়ে রাখা ছিল তারই একটি বড় উদাহরণ। তবে, এই সামরিক অভিযানের পেছনে যদি কোনো বাস্তবসম্মত কৌশলগত লক্ষ্য বা স্থায়ী বিজয়ের পরিকল্পনা না থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত তা একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতায় রূপ নিতে পারে।”
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির সিনিয়র গবেষক তৈমুর কাদিশেভ বিষয়টিকে ব্যয়বহুল ও স্বল্পব্যয়ী প্রযুক্তির লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “ইরানকে এই ধরনের ক্ষতি করতে আপনাকে অত্যন্ত জটিল এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল (মার্কিন/ইসরায়েলি) অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। অথচ ইরান মাত্র কয়েকটা সাধারণ বুলডোজার ব্যবহার করে অত্যন্ত সস্তা প্রযুক্তিতে সেই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে।”
সংঘাত চলাকালেও ইরান ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ অব্যাহত রাখে। এমনকি নির্মাণযন্ত্র লক্ষ্য করেও বিভিন্ন সময় হামলার অভিযোগ রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়।
সিএনএনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ৬৯টি সুড়ঙ্গমুখ হামলার কারণে অচল হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি সুড়ঙ্গমুখ ইতোমধ্যে পুনরায় চালু করা হয়েছে।
ইস্ফাহানের একটি ঘাঁটির চারটি সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করতে মিত্রবাহিনী অন্তত ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো দ্রুত ভরাট করা হয়েছে এবং ধ্বংস হওয়া সড়কও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে খামেনি নামের একটি ঘাঁটিতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অন্তত ১০টি নির্মাণযানকে পুনর্গঠন কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে প্রধান হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে আসছিলেন। গত মার্চে দেওয়া এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও লঞ্চারগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার” লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছিলেন।
গত মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, “ইরানের আর কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প অবশিষ্ট নেই এবং তারা সুড়ঙ্গ থেকে পুরনো ক্ষেপণাস্ত্র বের করলেও নতুন করে আর তৈরি করতে পারবে না।”
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ গভীর স্থাপনাগুলোতে থাকা ইরানের মূল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এখনো অনেকটাই অক্ষত রয়েছে। বিভিন্ন মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, দেশটির কাছে এখনও প্রায় এক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে।
এছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ড্রোন উৎপাদন এবং ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার তৈরির সক্ষমতাও প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত পুনর্গঠন করেছে।
সিএ/এমই


