মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সতর্কবার্তার পর দুবাই উপকূলে তেলবাহী একটি বড় ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে ইরান। হামলায় ট্যাঙ্কারটিতে আগুন ধরে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে এই ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গত সোমবার প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনে সক্ষম কুয়েতের পতাকাবাহী আল-সালমি নামের একটি ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্র বা সমুদ্র ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে এই ঘটনাটি ঘটেছে।
মাসব্যাপী চলা এই সংঘাত ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন সংকটে ফেলতে পারে।
কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তেলভর্তি ট্যাঙ্কারে হামলার খবর প্রকাশ করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়। ট্যাঙ্কারটিতে থাকা প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেলের বর্তমান বাজারমূল্য ২০ কোটি ডলারের বেশি। জাহাজটির মালিক কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে।
দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পর সৃষ্ট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়েছে। জ্বালানি মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার দেশটিতে গ্যাসের খুচরা মূল্য প্রতি গ্যালন চার ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০১ ডলার অতিক্রম করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশটির দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের সেনারা ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছেন।
এদিকে ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। তারা ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
তুরস্কের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। পরে ন্যাটোর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে সেটি ধ্বংস করা হয়।
অন্যদিকে ইসরায়েল তেহরান এবং বৈরুতে ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত শান্তিরক্ষীরা ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৬ এপ্রিলের আগেই তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার বিষয়ে ইরানকে নতুন করে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
লেভিট বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে, তবে প্রকাশ্যে তারা যে অবস্থান জানাচ্ছে তা ব্যক্তিগত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া বার্তার সঙ্গে মিলছে না।
এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও তিনি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে প্রস্তুত।
ইরান জানিয়েছে, পাকিস্তান, মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনার পর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি শান্তি প্রস্তাব পেয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রস্তাবটি ‘অবাস্তব, অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত’। তাঁর ভাষায়, ইরান বর্তমানে সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের মুখে রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘বড় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু যদি হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে ‘ব্যবসার জন্য খোলা’ না হয়, আমরা ইরানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলকূপ ও খারগ দ্বীপ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেব।’
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর কাছে এই যুদ্ধের ব্যয় বহনে সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ইতিমধ্যে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার অনুমোদনের আবেদনও করা হয়েছে।
সিএ/এমই


