আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যাপল পঞ্চাশ বছরে পা দিয়েছে। ১৯৭৬ সালের ১ এপ্রিল ক্যালিফোর্নিয়ার লস অল্টোসের একটি ছোট গ্যারেজে তিনজন উদ্যোক্তার হাতে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, বার্ষিক আয় ৪১৬ বিলিয়ন ডলার এবং সক্রিয় ডিভাইসের সংখ্যা ২২০ কোটিরও বেশি।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক বলেন, “পঞ্চাশ বছর আগে একটি ছোট গ্যারেজে একটি বড় ধারণার জন্ম হয়েছিল। অ্যাপল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই সরল বিশ্বাসে যে প্রযুক্তি ব্যক্তিগত হওয়া উচিত—যে বিশ্বাসটি তখন ছিল বৈপ্লবিক”।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াকের পাশাপাশি রোনাল্ড ওয়েন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনিই প্রথম অংশীদারিত্বের চুক্তি তৈরি করেন এবং কোম্পানির প্রাথমিক নথিপত্র প্রস্তুত করেন। তবে প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪০ দিনের মাথায় তিনি তার ১০ শতাংশ শেয়ার মাত্র ৮০০ ডলারে বিক্রি করে দেন, যা বর্তমান বাজারমূল্যে শত শত বিলিয়ন ডলারের সমান।
অ্যাপলের শুরুর দিকে বিনিয়োগ ও দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মাইক মার্কুলা। তিনি কোম্পানিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি ‘ফোকাস, ইম্পিউট, এমপ্যাথি’—এই তিন নীতির ভিত্তিতে বিপণন দর্শন দাঁড় করান। তার উদ্যোগেই অ্যাপল পেশাদার ব্যবস্থাপনায় আসে এবং মাইকেল স্কটকে প্রথম সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার সময়েই অ্যাপল ২ বাজারে সফলতা পায় এবং ১৯৮০ সালে বড় আইপিও সম্পন্ন করে।
স্টিভ ওজনিয়াকের তৈরি অ্যাপল ২-ই ছিল প্রথম ব্যবহারবান্ধব ব্যক্তিগত কম্পিউটারগুলোর একটি। পরবর্তীতে ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস, মাউস এবং আইকনের মাধ্যমে কম্পিউটার ব্যবহারে নতুন যুগের সূচনা করে।
ম্যাকিনটোশ প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন জেফ রাসকিন, যিনি সহজ ব্যবহারযোগ্য কম্পিউটারের ধারণা দেন। তবে পরবর্তীতে প্রকল্পের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে তার অবদান আড়ালে থেকে যায়। একইভাবে ম্যাকিনটোশের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার উন্নয়নে বারেল স্মিথ, অ্যান্ডি হার্জফেল্ড, স্টিভ কারে এবং বিল অ্যাটকিনসনের মতো অনেক প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
১৯৮৫ সালে স্টিভ জবস কোম্পানি ছাড়লেও ১৯৯৬ সালে অ্যাপলে ফিরে আসেন। তার নেতৃত্বে পণ্যের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয় এবং নতুন উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে আইম্যাক, ২০০১ সালে আইপড, ২০০৭ সালে আইফোন এবং ২০১০ সালে আইপ্যাড বাজারে এনে অ্যাপল প্রযুক্তি জগতে বিপ্লব ঘটায়।
বিশেষ করে আইফোনের মাধ্যমে স্মার্টফোনের ধারণা বদলে যায়। অ্যাপ স্টোর চালুর মাধ্যমে মোবাইল ফোন বহুমুখী ডিভাইসে পরিণত হয়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, আইফোন বিক্রি ও সেবার মাধ্যমে কোম্পানিটি বিপুল রাজস্ব অর্জন করেছে।
২০১১ সালে স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর টিম কুক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার সময়েই অ্যাপল অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য যেমন অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডস বাজারে আনে। পাশাপাশি অ্যাপল মিউজিক, আইক্লাউডসহ সেবাভিত্তিক খাতও বিস্তৃত হয়।
তবে অ্যাপলের পথচলায় ব্যর্থতাও রয়েছে। নিউটন মেসেজপ্যাড, অ্যাপল কার প্রকল্প কিংবা বিভিন্ন হার্ডওয়্যার বিতর্ক কোম্পানিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বর্তমানে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বাজার প্রতিযোগিতা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তবুও দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতায় অ্যাপল প্রমাণ করেছে, নতুন প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই তাদের শক্তি। টিম কুকের ভাষায়, “আমরা যদি কিছু শিখে থাকি, তাহলে তা হল—যেসব মানুষ পাগলের মতো ভাবে যে তারা পৃথিবী বদলে দিতে পারে, তারাই সেটা করে। তাই সেই পাগলদের প্রতি সালাম। বিদ্রোহীদের। সমস্যা সৃষ্টিকারীদের। বর্গাকার গর্তে ঢুকতে না চাওয়া গোল পেরেকগুলোর প্রতি”।
পঞ্চাশ বছরে অ্যাপল দেখিয়েছে প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রার অংশ। ভবিষ্যতে এই যাত্রা কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সিএ/এমআর


