মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও শক্তিশালী বস্তুগুলোর মধ্যে কোয়েসার অন্যতম। এদের প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ‘3C48’ ও ‘3C273’ নামের দুটি কোয়েসার বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে ‘3C’ নির্দেশ করে তৃতীয় কেমব্রিজ রেডিও উৎস তালিকাকে, যা ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয়।
রেডিও উৎস বলতে এমন মহাজাগতিক বস্তুকে বোঝায়, যা রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্যে প্রচুর শক্তি বিকিরণ করে। রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে এসব উৎস শনাক্ত করা সম্ভব। সাধারণ নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি দৃশ্যমান আলোতে উজ্জ্বল হলেও কোয়েসারগুলোর বিশেষত্ব হলো এদের তীব্র রেডিও বিকিরণ।
প্রথমদিকে ‘3C48’ ও ‘3C273’ কে নক্ষত্র মনে করা হলেও পরে দেখা যায়, এদের নির্গমন রেখা অস্বাভাবিক। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়, এগুলো আসলে লাল বিচ্যুতির কারণে পরিবর্তিত পরিচিত বর্ণালী রেখা। এদের লাল বিচ্যুতি যথাক্রমে z=০.৩৬৭ ও z=০.১৫৮, যা নির্দেশ করে তারা আমাদের থেকে বিপুল দূরত্বে অবস্থান করছে।
জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবলের সূত্র অনুযায়ী, এসব কোয়েসার কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আরও উচ্চ লাল বিচ্যুতিসম্পন্ন কোয়েসার আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মহাবিশ্বের বিস্তৃতি ও গতিশীলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
কোয়েসারের উজ্জ্বলতা অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে এদের দ্যুতি নাটকীয়ভাবে বাড়ে বা কমে। সর্বোচ্চ অবস্থায় একটি কোয়েসার সাধারণ গ্যালাক্সির তুলনায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। এত ক্ষুদ্র অঞ্চলে এত বিপুল শক্তি উৎপাদন বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য।
ধারণা করা হয়, কোয়েসারের কেন্দ্রে বিশাল ভরের ব্ল্যাকহোল রয়েছে, যার ভর সূর্যের তুলনায় প্রায় শত মিলিয়ন গুণ বেশি। এই ব্ল্যাকহোলের প্রভাবে নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে বিপুল শক্তি নির্গত করে। এই প্রক্রিয়াই কোয়েসারের অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতার ব্যাখ্যা দেয়।
তবে কোয়েসার স্থানীয় না মহাজাগতিক—এ নিয়েও বিতর্ক ছিল। কিছু বিজ্ঞানী মনে করতেন, এগুলো কাছাকাছি অবস্থান করলেও উচ্চগতির কারণে লাল বিচ্যুতি ঘটে। তবে অধিকাংশ জ্যোতির্বিজ্ঞানীর মতে, কোয়েসার আসলে অত্যন্ত দূরের মহাজাগতিক বস্তু।
বর্তমানে ধারণা করা হয়, কোয়েসার মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থল, যেখানে বিশাল ব্ল্যাকহোলের কার্যকলাপ থেকে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়।
সিএ/এমআর


