যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানার পরাজয়কে কেন্দ্র করে দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। পরাজয়ের দায় নিয়ে দলের দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে এবং পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঝিকরগাছা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলা বিএনপির নেতারা যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরাজয়ের জন্য সাবিরা সুলতানাকে দায়ী করেন। তবে তাদের অভিযোগ নাকচ করে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন সাবিরা সুলতানা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান (সামাদ নিপুন)। তিনি বলেন, ‘সাবিরা সুলতানা বিএনপি নেতা নাজমুল ইসলামের (তাঁর স্বামী) হত্যার আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু তিনি নাজমুল হত্যার বিচার দাবি করেননি। তিনি রাজনীতিতে অদূরদর্শী, অজ্ঞ ও অদক্ষ। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না করে একের একের এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতারা দলে জায়গা পাননি। যে কারণে নেতা-কর্মীরা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। তারপরও আমরা নির্বাচনে তাঁর পক্ষে কাজ করেছি। কিন্তু তিনি আমাদের সবাইকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছেন। ফলে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। এখন নিজের ব্যর্থতার দায় আমাদের ঘাড়ে চাপাতে চান। তিনি কেন্দ্রে ও গণমাধ্যমে আমাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন, যা দলের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করছে।’
সংবাদ সম্মেলনে ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোর্তজা এলাহী এবং চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জহিরুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পরাজিত প্রার্থী ও ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘যারা সংবাদ সম্মেলন করেছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে আমাকে পরাজিত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছে। তাঁদের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা চৌগাছা বিএনপির সভাপতি জহিরুল ইসলাম দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। ব্যালটে তাঁর নাম ছিল। তিনি কিছু ভোটও পেয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাঁরা বিশেষ বিশেষ সময়ে দলের বিপক্ষে কাজ করেন। ৫ আগস্টের আগে তাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে কাজ করেছেন। পরে এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদকসহ নানা অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। দফায় দফায় জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করে আর্থিক লেনদেন করেছেন। দল আমাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করেই মনোনয়ন দেয়। আমি নির্বাচিত হলে তাঁদের অনৈতিক কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এ আশঙ্কায় তাঁরা নির্বাচনে আমার বিরোধিতা করেছেন।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে যশোর-2 আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানা জামায়াতের প্রার্থী মোসলেহ উদ্দীন ফরিদের কাছে পরাজিত হন। নির্বাচনের পর থেকেই দুই উপজেলার নেতাদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল নেতারা আশঙ্কা করছেন, দলের এই বিভক্তি সামনে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে আমরা পরাজিত হয়েছি। আমাদের দলের মধ্যে বিভক্তির কারণে সামনে স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে। এই নির্বাচনে আমরা বিভক্তি বাদ দিয়ে আবার মিলেমিশে রাজনীতিতে পথ চলতে চাই।’
অন্যদিকে সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘দলের মধ্যে অনৈক্য থাকলে তৃণমূলে প্রভাব তো পড়েই। আমাদের কাছে যেকোনো নির্বাচনই গুরুত্বপূর্ণ। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আমাকে যখন যে নির্দেশনা দিয়েছে, আমি তা অনুসরণ করেছি। আওয়ামী লীগের সময়ে যখন কথা বলা যেত না, তখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমি জয়ী হয়েছি। নির্বাচনের মাধ্যমে উপজেলা বিএনপির সভাপতি হয়েছি। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আমি শিগগিরই সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করব।’
সিএ/এমই


