ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশে কাজের পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশির হতাহতের খবরও পাওয়া গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে চলমান বহু প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টেও একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কবে নাগাদ এসব কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার আর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস সময়কালেও এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং কিছু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। এর মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, লিবিয়া, কাতার ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধের প্রভাবে অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অনেক দেশের শ্রমবাজার বিদেশি কর্মীদের জন্য সীমিত হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দুবাইয়ের একটি বেসরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে কর্মরত বাংলাদেশি ডেন্টিস্ট নওরীন মেহজাবীন দীতি জানান, দিনরাত তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, “দিনরাত আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি। কখন মাথার ওপর মিসাইল বা ড্রোন এসে পড়বে সেই ভয় তাড়া করছে সবসময়। দুই দিন ধরে কাজে যেতে পারছি না। কবে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারছে না। দেশে আসার অবস্থাও এখন নেই।”
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, যাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহকে সচল রাখে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সংঘাতের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত অনেক ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এতে ছুটিতে দেশে আসা হাজারো প্রবাসী কর্মী কর্মস্থলে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা নবায়ন করছে না বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে। যেসব প্রবাসী কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তাদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক প্রবাসী দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দাবি করছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। মোট অভিবাসী শ্রমিকের প্রায় ৬৭ শতাংশই সৌদি আরবে কর্মরত। এছাড়া কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানেও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে এই অঞ্চলের অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়েও এই রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। এর ফলে ওই অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রাফিউদ্দীন আহমেদ বলেন, “এই যুদ্ধের পরিণতি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে যদি সংঘাত আরও দুই সপ্তাহ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে। এতে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না থেকেও বাংলাদেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।”
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হুমায়ুন কবির এক অনুষ্ঠানে বলেন, “যারা প্রবাসে আছেন, তারা আমাদের টপ মোস্ট প্রায়োরিটি। বর্তমান সংকটে যাদের টিকিট রিইস্যু বা ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে সরকার উদ্যোগ নেবে। অ্যাফেক্টেড দেশগুলোতে থাকা আমাদের প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে যা করা প্রয়োজন, সরকার তা করবে।”
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ঝুঁকিতে পড়েছে। সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেকেই চাকরি হারাতে পারেন এবং নতুন শ্রমিকদের জন্য সুযোগ কমে যেতে পারে। এতে রেমিট্যান্সেও বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।”
সিএ/এএ


