ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসায় সফল হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। কিন্তু অনেক ধরনের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয় এবং চিকিৎসাও জটিল হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় ভারতে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে একটি আধুনিক মাল্টি-ক্যানসার ব্লাড টেস্ট, যা মাত্র একবার রক্তের নমুনা দিয়েই ১০ ধরনের সাধারণ ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত শনাক্ত করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ক্যানসার নিশ্চিত করার পরীক্ষা নয়। বরং এটি একটি স্ক্রিনিং পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার কতটা কমাতে পারবে, কারা নিয়মিত এ পরীক্ষা করাবেন এবং কত বছর পরপর এটি করা উচিত—এসব বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ভারতের জাইডাস লাইফ সায়েন্সেস এবং অ্যাপোলো হসপিটালস যৌথভাবে ‘শিল্ড মাল্টি-ক্যানসার ডিটেকশন’ পরীক্ষা চালু করছে। যুক্তরাষ্ট্রের গার্ডেন্ট হেলথের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি প্রাথমিকভাবে ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োগ করা হবে।
কীভাবে কাজ করে এই পরীক্ষা?
এই পরীক্ষার জন্য শরীর থেকে একবার মাত্র রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর রক্তে ভাসমান ডিএনএর বিশেষ মিথাইলেশন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে ক্যানসারের সম্ভাব্য উপস্থিতির ইঙ্গিত খোঁজা হয়। উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় অনেক ক্ষেত্রে কেবল ক্যানসারের সংকেতই নয়, সেটি শরীরের কোন অঙ্গ থেকে শুরু হয়ে থাকতে পারে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।
যেসব ক্যানসারের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব
শিল্ড মাল্টি-ক্যানসার ডিটেকশন পরীক্ষার মাধ্যমে স্তন, ফুসফুস, কোলোরেক্টাল বা বৃহদান্ত্র, লিভার, পাকস্থলী, খাদ্যনালি, অগ্ন্যাশয়, ডিম্বাশয়, প্রোস্টেট এবং মূত্রাশয়—এই ১০ ধরনের ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকির সংকেত শনাক্ত করা যেতে পারে।
এর মধ্যে অনেক ক্যানসারই সাধারণত দেরিতে শনাক্ত হয় এবং এসব রোগে মৃত্যুঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি জানা গেলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এটি কি ক্যানসার নিশ্চিত করবে?
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা নয়, বরং স্ক্রিনিং টেস্ট। অর্থাৎ রিপোর্টে ক্যানসারের সম্ভাব্য সংকেত পাওয়া গেলেই রোগ নিশ্চিত হয়েছে—এমনটি বলা যাবে না। সে ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এন্ডোস্কোপি বা বায়োপসিসহ অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও শতভাগ নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তাই ম্যামোগ্রাফি, কোলোনোস্কোপি বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্ক্রিনিং পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে এই পরীক্ষা ব্যবহার করা যাবে না।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এমন কিছু ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, যেগুলোর জন্য এখনো নিয়মিত জনভিত্তিক স্ক্রিনিং ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে অগ্ন্যাশয়, ডিম্বাশয়, পাকস্থলী এবং লিভারের ক্যানসার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেরিতে শনাক্ত হয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় যা জানা গেছে
এশিয়ার ছয়টি দেশে ৮৪ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাল্টি-ক্যানসার ব্লাড টেস্ট প্রায় ৭৯ শতাংশ নিশ্চিত ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। যাদের ক্যানসার ছিল না, তাদের ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে পরীক্ষাটি সঠিকভাবে নেগেটিভ ফলাফল দিয়েছে।
এ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরীক্ষাটি ক্যানসারের সম্ভাব্য উৎস অঙ্গ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে, যা পরবর্তী পরীক্ষার পথ সহজ করতে পারে। তবে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে গবেষকরা মত দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ক্যানসার গবেষকদের মতে, এক ফোঁটা রক্তের মাধ্যমে একাধিক ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এটি এখনো সহায়ক স্ক্রিনিং পদ্ধতি মাত্র। তাই কোনো উপসর্গ দেখা দিলে বা চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে প্রচলিত পরীক্ষা, ইমেজিং কিংবা বায়োপসির বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
সহজভাবে বলতে গেলে, এই নতুন ব্লাড টেস্ট ক্যানসার নিশ্চিত করে না; তবে সময় থাকতে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার একটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিএ/এমআর


