ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় সম্প্রতি বাঘের প্রজনন কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বাঘ দম্পতি বেলি ও টগরের ঘরে চারটি শাবকের জন্ম হলেও এর আগে একই চিড়িয়াখানায় ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রজননের সময় সাদা বাঘিনী জুঁইয়ের মৃত্যু বাঘের প্রজনন আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
জানা যায়, ২০২২ সালে জন্ম নেওয়া জুঁই ছিল জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রথম সাদা বাঘ। পরিণত বয়সে পৌঁছানোর পর তাকে কসমস নামের একটি পুরুষ বাঘের সঙ্গে রাখা হয়। প্রজননকালীন মিলনের সময় কসমসের কামড়ে জুঁই গুরুতর আহত হয়। পরে শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ সাধারণত একাকী জীবনযাপন করে। শুধু প্রজননের সময় স্ত্রী ও পুরুষ বাঘের মিলন ঘটে। বাঘিনী প্রজননের উপযুক্ত সময়ে বিভিন্ন আচরণগত সংকেত দেয়, যার মাধ্যমে পুরুষ বাঘ আকৃষ্ট হয়। মিলনের সময় পুরুষ বাঘ সাধারণত বাঘিনীর ঘাড় বা গলার ঢিলা চামড়ায় দাঁত বসিয়ে ধরে রাখে। প্রাণীবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই আচরণ বাঘিনীকে স্থির রাখতে, আত্মরক্ষামূলক আক্রমণ ঠেকাতে এবং প্রজনন প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে সহায়তা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাঘের প্রজনন প্রক্রিয়ায় হরমোন নিঃসরণ ও ডিম্বস্ফোটন উদ্দীপিত করতে নির্দিষ্ট শারীরিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মিলনের সময় পুরুষ বাঘের ঘাড়ে কামড় এবং অন্যান্য জৈবিক বৈশিষ্ট্য বাঘিনীর প্রজনন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হয়। তবে কখনো কখনো এই আচরণ প্রাণঘাতী রূপও নিতে পারে।
প্রকৃতির পরিবেশে বাঘিনী বিপদ অনুভব করলে সহজেই সরে যেতে পারে। কিন্তু চিড়িয়াখানার সীমাবদ্ধ পরিবেশে পালানোর সুযোগ কম থাকায় আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দি অবস্থায় বাঘের প্রজননের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জায়গা, মানসিক চাপ কমানো এবং ধাপে ধাপে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের বিভিন্ন চিড়িয়াখানাতেও প্রজননকালে বাঘ বা বাঘিনীর আহত কিংবা মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রজনন প্রক্রিয়া প্রজাতি টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য হলেও তা কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী চিকিৎসা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান বলেন, নতুন বাঘ ও বাঘিনীকে একসঙ্গে রাখার আগে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন। এতে সফল প্রজননের সম্ভাবনা বাড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।
তিনি আরও বলেন, সাদা বা অ্যালবিনো বাঘের ক্ষেত্রে প্রজনন নিয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ এসব বাঘ সাধারণত অন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে জন্ম নেয় এবং তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্বাভাবিক বাঘের তুলনায় কম হতে পারে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক চিড়িয়াখানায় সাদা বাঘের প্রজনন নিরুৎসাহিত করা হয়।
প্রকৃতির নিয়মে বাঘের প্রজনন প্রক্রিয়া কখনো কোমল, কখনো কঠিন। তবে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীতে টিকে আছে বাঘের মতো মহিমান্বিত প্রাণী।
সিএ/এমআর


