কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের যোগাযোগ সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একসময় যা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয় ছিল, এখন তা গবেষণাগারে গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাণীদের শব্দ, আচরণ ও সংকেত বিশ্লেষণে এআই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সীমিত যোগাযোগের পথ তৈরি করতে পারে।
মানুষের দীর্ঘদিনের কৌতূহল ছিল তিমি, ডলফিন কিংবা পাখিদের বার্তা বোঝার বিষয়ে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাণীদের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে এমন অনেক সংকেত শনাক্ত করা যাচ্ছে, যা মানুষের পক্ষে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঁদুর, ডলফিন, তিমি, পাখি ও কাটলফিশের মতো প্রাণীদের যোগাযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। গবেষকেরা এআইয়ের সাহায্যে প্রাণীদের বিভিন্ন ধরনের ডাক, স্বতন্ত্র শব্দসংকেত এবং যোগাযোগের ধরণ বিশ্লেষণ করছেন। এসব সংকেতের মধ্যে নির্দিষ্ট তথ্য বা বার্তা লুকিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি গবেষণায় আফ্রিকার স্ট্রাইপড ইঁদুরের ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি শব্দ বিশ্লেষণ করে একাধিক স্বতন্ত্র ডাক শনাক্ত করা হয়েছে। একইভাবে ডলফিন, তিমি, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং প্রাইমেটদের যোগাযোগব্যবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, বিপুল তথ্যভান্ডারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা জটিল সম্পর্ক ও ধারা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এআইয়ের সক্ষমতা প্রাণীজগত সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে তিমির ‘কোডা’ নামে পরিচিত ক্লিকধ্বনি নিয়ে গবেষণা বেশ এগিয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করছেন, এসব সংকেতের মধ্যে মানুষের ভাষার মতো কোনো কাঠামো রয়েছে কি না। তারা খুঁজে দেখছেন, তিমির শব্দে পরিচয়সূচক সংকেত, উপভাষা, শব্দগুচ্ছ কিংবা ব্যাকরণগত নিয়মের মতো বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান কি না। কিছু গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করছে, তিমির যোগাযোগব্যবস্থা পূর্বধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
তবে গবেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কোনো সংকেত বিশ্লেষণ করা আর সেটিকে মানুষের ভাষার মতো অনুবাদ করা এক বিষয় নয়। প্রাণীরা পৃথিবীকে মানুষের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে অনুভব করে। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কিংবা বার্তা সরাসরি মানুষের ভাষায় রূপান্তর করা এখনো বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ।
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা প্রাণীদের ভাষা অনুবাদের দাবি করার চেয়ে তাদের যোগাযোগব্যবস্থার গঠন, উদ্দেশ্য ও অর্থ বোঝার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশার জন্ম হয়েছে।
সিএ/এমআর


