ইসলামের দৃষ্টিতে চিকিৎসা পেশা একটি সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব। এটি শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং সঠিক নিয়ত ও নৈতিকতা বজায় থাকলে ইবাদতের মর্যাদাও লাভ করতে পারে। একজন চিকিৎসক যতই দক্ষ ও অভিজ্ঞ হোন না কেন, তাঁর অন্তর পবিত্রতা, সততা ও উত্তম আচরণ না থাকলে রোগীর কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে। তাই চিকিৎসকের জন্য নৈতিক আদব, আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদব বলতে উত্তম নৈতিক গুণাবলি ও শিষ্টাচারকে বোঝানো হয়। চিকিৎসকের পেশাগত জীবনে এসব আদব অনুসরণ করলে তিনি আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু হয়ে উঠতে পারেন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে চিকিৎসকের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব ও নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, অন্তরের পবিত্রতা ও নিয়তের বিশুদ্ধতা। একজন চিকিৎসকের উচিত তাঁর কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াব কামনা করা। খ্যাতি, অর্থ বা প্রশংসার উদ্দেশ্যে কাজ করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভর করে, আর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তা-ই আছে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি হাদিস : ১)
দ্বিতীয়ত, কাজের নিপুণতা ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা। চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ যত্ন ও দক্ষতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা ভালোভাবে করে।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা : ৭/৩৪৯)
তৃতীয়ত, আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতা রাখা। চিকিৎসক বিশ্বাস করবেন যে তাঁর জ্ঞান ও চিকিৎসা কেবল একটি মাধ্যম মাত্র। প্রকৃত আরোগ্য দানকারী আল্লাহ তাআলা। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি যখন অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে আরোগ্য দেন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮০)
চতুর্থত, তাকদিরে সন্তুষ্ট থাকা। সুস্থতা বা মৃত্যু সবই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘটে। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জেনে রাখো, যদি গোটা মানবজাতি তোমার উপকার করতে চায়, তারা উপকার করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন ততটুকু ছাড়া। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে চায়, তারা ক্ষতি করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন শুধু ততটুকুই। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৬) তাই চিকিৎসকের উচিত অহংকার পরিহার করা।
পঞ্চমত, শরিয়তের আলোকে চিকিৎসায় উপদেশ দেওয়া। চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু ওষুধ দেওয়া নয়, বরং রোগীকে আল্লাহর জিকির, দোয়া ও সদকার মতো আমল করতে উৎসাহিত করা। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) তিন ভাবে চিকিৎসা করতেন, (১) প্রাকৃতিক ওষুধ দিয়ে, (২) আল্লাহর দেওয়া ইলাহী চিকিৎসা দ্বারা, (৩) অথবা এই দুইয়ের সমন্বয়ে।’ (জাদুল মা’আদ : ৪/২২)
ষষ্ঠত, চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা। অস্ত্রোপচার, ছুটি, গর্ভনিরোধক ব্যবহার বা বড় কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সঠিক ও ন্যায়সংগত পরামর্শ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে যেন আমানতদার হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২৮)
সপ্তমত, হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা না করা। নবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রোগও নাজিল করেছেন এবং তার প্রতিকার (ওষুধ)ও দিয়েছেন। প্রত্যেক রোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ওষুধ রেখেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, তবে হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা কোরো না।’ (সহিহুল জামে : ১৬৩৩)
অষ্টমত, রোগীকে পরীক্ষার বস্তু না বানানো। প্রমাণিত নয় এমন ওষুধ বা ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকা জরুরি, যদি না বিকল্পের ক্ষতি আরও বেশি হয়।
নবমত, রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা। ওষুধ, টেস্ট বা অপারেশনের পরামর্শ দেওয়ার সময় রোগীর সামর্থ্য বিবেচনা করা মানবিক দায়িত্ব।
দশমত, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা। রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ও শারীরিক গোপনীয়তা সংরক্ষণ করা চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব।
একাদশত, রোগীদের সঙ্গে কোমল আচরণ করা। রোগীর সঙ্গে নম্রতা, সহানুভূতি ও সৌজন্যমূলক আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা। নবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রফিক (কোমল); তিনি কোমলতা পছন্দ করেন এবং যা কোমলতার মাধ্যমে দেন, তা কঠোরতার মাধ্যমে দেন না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৩)
সবশেষে বলা যায়, চিকিৎসা পেশাকে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে এবং সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
সিএ/এমআর


