দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ১০৭ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর নজরদারি, টহল জোরদার এবং সীমান্তবর্তী এলাকাবাসীর সহযোগিতার কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) ভোর থেকে শনিবার (৬ ডিসেম্বর) ভোর পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।
বিজিবি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রেখে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে কাজ করছে বাহিনীটি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ২৮ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। এতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৮ জন শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। পরে দুই দিন ধরে সীমান্ত এলাকায় অবস্থানের পর তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে বিজিবি।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্ত দিয়ে আরও ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ সময় সীমান্ত এলাকায় অবস্থানের পর বিএসএফ তাদের পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়।
নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, খবর পাওয়ার পর ওই স্থানে বিজিবির টহল বৃদ্ধি করা হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে শুরুতে শূন্যরেখায় থাকতে দিলেও সন্ধ্যার পরে তাদেরকে নো-ম্যান্সল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাত ১টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেন। এরপর রাতের আঁধারে তারা পুশইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ভারতে ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও আদিতমারী উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ৩৩ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। পরে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান শেষে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে সরিয়ে নেওয়া হয়।
লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করা মানুষদের নিজ ভূখণ্ডে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। যে কোনো ধরনের পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সর্বদাই সীমান্তে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে ছয়জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর প্রতিরোধের কারণে তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঁটাতারের একটি অংশ খুলে দিয়ে তাদের প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছিল।
তেঁতুলবাড়ীয়া বিওপির কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান বলেন, পুশইনকৃতদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বিএসএফকে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হচ্ছে। অবৈধ কোনো অনুপ্রবেশ কিংবা পুশইন বাংলাদেশ মেনে নেবে না। সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকতে পারেনি এবং সীমান্তের ভারতীয় অংশে অবস্থান নেয়। বিষয়টি নিয়ে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান হয়নি।
নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি তাদের বলেছি, যেহেতু তারা ভারতের অভ্যন্তরে ছিল, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের (আইসিপি) মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো উচিত। রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে এভাবে ফেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো ধরনের পুশইন বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের ফেরত পাঠাতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ ১১ জনকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালানো হয়। বিজিবির টহল দল সীমান্তের ওপারে সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে সতর্ক অবস্থান নেয়। ফলে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি।
দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, মশালগাঁও সীমান্তে ১১ জনকে পুশইনের একটি চেষ্টা বিজিবি সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সীমান্তে আমাদের সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বর্তমানে ওই ব্যক্তিরা ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বদা দায়িত্বশীল, পেশাদার এবং তৎপর রয়েছে।
অন্যদিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া সীমান্তে ৫ থেকে ৬ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর প্রস্তুতির তথ্য পেয়ে সতর্কতা জোরদার করে বিজিবি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় সম্ভাব্য সেই প্রচেষ্টা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নুরুল আমিন বায়েজীদ বলেন, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার আন্তর্জাতিক সীমানা রক্ষায় এবং যেকোনো অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে বিজিবি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্তে মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন রোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সিএ/এমই


