নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের পানতিতা খেয়াঘাট থেকে টেপারি গ্রামমুখী প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক পাকা করার কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মধ্যে মতবিরোধের কারণে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সোমবার (৫ মে ) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে গেছে, কোথাও কাদা সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও খোয়া উঠে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কেউ জুতা হাতে নিয়ে হাঁটছেন, কেউ মোটরসাইকেল ঠেলে পার হচ্ছেন, আবার কেউ কাঁধে বাইসাইকেল বহন করছেন। সড়কের দুই পাশে নির্মাণকাজের জন্য ফেলে রাখা ইটের খোয়ার স্তূপ চলাচলকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
জেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পানতিতা খেয়াঘাট থেকে টেপারি অভিমুখী সড়কটি পাকা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে দুই কোটি ৯২ লাখ ৮৫ হাজার ৯২৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফকির এন্টারপ্রাইজ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হলেও প্রায় অর্ধেক অগ্রগতির পর পাউবোর আপত্তিতে তা বন্ধ হয়ে যায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, এলজিইডির অনুমোদন নিয়েই তারা কাজ শুরু করেন। তবে মাঝপথে পাউবো জানায়, ওয়াপদার আওতাধীন এই সড়কে কাজ করতে হলে তাদের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। বিষয়টি জানার পর এলজিইডি এনওসি চাইলেও এরই মধ্যে একই সড়কে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাউবোর একটি প্রকল্প অনুমোদন পায়। ফলে ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো সংস্থাকে কাজ করতে দিতে রাজি নয় পাউবো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখায় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এতে আট গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
পানতিতা গ্রামের বাসিন্দা সুব্রত সিকদার বলেন, বর্ষাকালে কাদার ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে জুতা খুলে হাতে নিয়ে চলতে হয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল নিয়ে চলাফেরা করা এখন ভীষণ কষ্টকর। সড়কটি পাকা করার কাজ শুরু হলে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে কাটা মাটি স্তূপ করে রাখায় চলাচল আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
এদিকে সম্প্রতি সড়কটি পরিদর্শনে গিয়ে পাউবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগবিতণ্ডা হয়, যা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় পাউবো স্থানীয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছে। পাল্টা হিসেবে মামলার আসামিরা সড়কের জমি নিজেদের দাবি করে পাউবোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করেছেন।
পানতিতা গ্রামের আরেক বাসিন্দা দীপক রায় বলেন, দীর্ঘদিনের কাঁচা রাস্তাটি পাকা করার দাবি ছিল গ্রামের মানুষের। দুই দপ্তরের টানাপোড়েনে কাজ বন্ধ থাকায় আমরা হতাশ। পাউবো রাস্তার কাজে বাধা দেওয়ায় গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের ওপর হামলা করেন। এ ঘটনায় পাউবো ও স্থানীয়দের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে।
এদিকে কাজ বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফকির এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আমরা এলজিইডি থেকে অনুমোদন নিয়ে কাজ শুরু করি। কিন্তু মাঝপথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাউবো। কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ধার-দেনা করে কেনা মালামাল রাস্তায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে। দুই দপ্তরে টানাহেঁচড়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।
নড়াইল এলজিইডি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর বলেন, মুলিয়া-পানতিতা সড়কে পাউবোর একটি বাঁধ রয়েছে। বাঁধের ওপর কাজ করতে হলে তাদের কাছ থেকে আমাদের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া লাগে। এটা নেওয়া হয়নি। এরপর ঠিকাদার সেখানে কাজ শুরু করলে পানি উন্নয়ন বোর্ড চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করতে বলে। তখন থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, ওয়াপদার এই সড়কে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প চলমান। সেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কাউকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
সিএ/এমই


