বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকেন অনেক মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চাপকে স্বাভাবিক বলে উপেক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মানসিক চাপই সাধারণত হৃদরোগের একমাত্র কারণ নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মানসিক চাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যান্য শারীরিক ঝুঁকির সঙ্গে এটি যুক্ত হলে হৃদরোগের সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পায়।
মানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নামে দুটি হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এগুলো শরীরকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করে। ফলে হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। স্বল্প সময়ের জন্য এসব পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত, শরীরে প্রদাহ এবং রক্তে শর্করার মাত্রার পরিবর্তনের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ অনেকের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ সময় ধরে রক্তচাপ বেশি থাকলে রক্তনালীর ক্ষতি হয় এবং হৃদযন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এছাড়া মানসিক চাপ রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
‘কিউরিয়াস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, বিরল কিছু ক্ষেত্রে তীব্র মানসিক চাপ ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ নামে পরিচিত একটি অস্থায়ী হৃদরোগের কারণ হতে পারে। এ অবস্থায় হৃৎপেশি সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণত কোনো আকস্মিক মানসিক আঘাত, যেমন প্রিয়জনকে হারানোর পর এটি দেখা দিতে পারে।
মানসিক চাপের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে জীবনযাপনের অভ্যাসে। অনেকেই চাপ মোকাবিলায় ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত খাওয়া, মদ্যপান বা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো অভ্যাস গড়ে তোলেন। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। এসব কারণে স্থূলতা, উচ্চ কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা যোগব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও চর্বিহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ভালো ঘুম হৃদস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজনে পরিবার, বন্ধু বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিএ/এমআর


