খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা শুরু হয়। কারও ক্ষেত্রে এটি জ্বালাপোড়ার মতো অনুভূত হয়, যা ধীরে ধীরে বুক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার কারও পেটে মোচড়, গ্যাস, ফাঁপাভাব কিংবা একপাশে তীব্র ব্যথাও দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, মাঝেমধ্যে এমন সমস্যা হলেও খাওয়ার পর নিয়মিত পেটব্যথা হলে সেটিকে শুধু বদহজম ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছানোর পরপরই হজম প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় পাকস্থলীতে অ্যাসিডের উৎপাদন বাড়ে, পরিপাকতন্ত্রের পেশিগুলো সংকুচিত হয় এবং পিত্তথলি ও অন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ হজম প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই প্রক্রিয়ার কোনো অংশে সমস্যা থাকলে খাবার গ্রহণের পর ব্যথা শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যথার ধরন, অবস্থান, খাওয়ার কতক্ষণ পর ব্যথা হচ্ছে এবং কোনো নির্দিষ্ট খাবার সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না—এসব তথ্য রোগের কারণ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ব্যথার স্থান ও প্রকৃতি চিকিৎসকের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা জরুরি।
তলপেটের উপরের অংশে জ্বালাপোড়া ধরনের ব্যথা হলে তা পাকস্থলীর প্রদাহ বা আলসারের লক্ষণ হতে পারে। আবার চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর পেটের ডান দিকের উপরের অংশে তীব্র মোচড়ানো ব্যথা হলে পিত্তথলির সমস্যার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে নাভির চারপাশে খিঁচুনি বা অস্বস্তি দেখা দিলে ক্ষুদ্রান্ত্রের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত মিলতে পারে।
যখন পাকস্থলীর অ্যাসিড সমস্যার কারণ হয়
খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি তলপেটে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়, তাহলে এর পেছনে গ্যাস্ট্রাইটিস, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা পাকস্থলীর আলসারের মতো সমস্যা থাকতে পারে। বিশেষ করে লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্ফিংটার ঠিকভাবে বন্ধ না হলে পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালীতে ফিরে আসে। এতে বুকের নিচের অংশে তীব্র জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি দেখা দেয়।
গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি) বিশ্বজুড়ে বহু মানুষের পরিচিত একটি সমস্যা। এ অবস্থায় পাকস্থলীর খাবার বারবার খাদ্যনালীতে ফিরে আসে, যার ফলে বুকজ্বালা ও অস্বস্তি দেখা দেয়। একইভাবে গ্যাস্ট্রাইটিস বা আলসার থাকলে খাবার খাওয়ার পর অ্যাসিড উৎপাদন বেড়ে গিয়ে ব্যথা আরও বাড়তে পারে।
পিত্তথলি ও অন্ত্রের সমস্যাও হতে পারে কারণ
সব ধরনের পেটব্যথার উৎস পাকস্থলী নয়। বিশেষ করে তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর যদি শরীরের ডান দিকের উপরের অংশে তীব্র ব্যথা শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, তাহলে পিত্তথলিতে পাথর বা প্রদাহের সম্ভাবনা থাকতে পারে। খাবার খাওয়ার পর পিত্তথলি সংকুচিত হয়ে পিত্তরস বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু পাথর পিত্তনালি আটকে দিলে সেই সংকোচন থেকেই তীব্র ব্যথা সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে নাভির চারপাশে ব্যথা বা অস্বস্তি ক্ষুদ্রান্ত্রের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত।
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম ও খাদ্য অসহিষ্ণুতা
পরিপাকতন্ত্রে খাবার এগিয়ে নিতে স্বাভাবিকভাবেই পেশির সংকোচন ঘটে। তবে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) বা ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ থাকলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যথার কারণ হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের মতো খাদ্য অসহিষ্ণুতাও সমস্যা সৃষ্টি করে। দুধজাত খাবার হজমে অসুবিধা হলে পেট ফাঁপা, অতিরিক্ত ঢেকুর, গ্যাস ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
তলপেটের ব্যথার ক্ষেত্রেও কোলনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খাবার অন্ত্রে প্রবেশ করার পর কোলন নতুন খাবারের জন্য জায়গা তৈরি করতে সংকুচিত হয়। এ সময় গ্যাস আটকে গেলে ব্যথা হতে পারে। কোলাইটিস বা ডাইভার্টিকুলার ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রোকোলিক রিফ্লেক্সের কারণে খাওয়ার পর হঠাৎ পেটে ক্র্যাম্প এবং দ্রুত শৌচাগারে যাওয়ার তাগিদও দেখা দিতে পারে।
সূত্র: এইচএন
সিএ/এমআর


