সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত সোডারটেলিয়া শহরে গত এক দশকে মুসলিম সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয় বা নতুন কোনো শরণার্থী সংকট নয়, বরং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দক্ষ পেশাজীবীদের স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করাই প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে শহরটির মুসলিম সমাজ যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, পরিচয় ও একীভূত হওয়া নিয়ে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে।
সোডারটেলিয়ার ইসলামিক কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্তদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে একটি মসজিদে নিয়মিত আসা মুসলিম পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে বেড়ে ৩০০-তে পৌঁছেছে। স্থানীয় মুসলিমদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিম প্রকৌশলী, গবেষক ও পেশাজীবীরা এখানে এসে পরিবারসহ বসবাস শুরু করেছেন।
স্থানীয় ট্রাক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্ক্যানিয়ার কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার আফিফ আসালি বলেন, যখন তিনি বড় হচ্ছিলেন তখন মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তার ভাষায়, ২০০৮ সালের দিকে এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং ২০১৫ সালের অভিবাসন সংকটের সময় এটি আরও গতি পায়। এরপর থেকে মুসলিম পরিবারের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্টকহোম থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত প্রায় এক লাখ জনসংখ্যার সোডারটেলিয়া শহরে স্ক্যানিয়া ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশের দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে আসা অনেক মুসলিম কর্মী পরবর্তীতে পরিবারসহ এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মুসলিম সমাজের আকার ও কার্যক্রমেও।
সুইডেনে ইসলাম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে সোডারটেলিয়ার এই অভিজ্ঞতাকে অনেকেই ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে মুসলিমদের একীভূত হওয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এমনকি অতি-ডানপন্থী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের নেতা জিমি আকেসন চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত একটি তথ্যচিত্রে দাবি করেছিলেন, একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পক্ষে প্রকৃত সুইডিশ হওয়া বেশ কঠিন।
তবে সোডারটেলিয়ার বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এখানে কর্মরত মুসলিম প্রকৌশলী, চিকিৎসক, গবেষক ও ফার্মাসিস্টরা নিয়মিত কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শুক্রবার জুমার নামাজে অংশ নেন। তাদের সন্তানরা স্কুলে সুইডিশ ভাষায় কথা বললেও পরিবারে আরবি ভাষা ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কর্মজীবন, ধর্মীয় অনুশীলন এবং পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে তারা ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলেছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে শহরটির অতীত ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সোডারটেলিয়া ইউরোপের অন্যতম বড় অ্যাসিরীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৭০-এর দশকে স্ক্যানিয়া কোম্পানি তুরস্ক থেকে অ্যাসিরীয় খ্রিষ্টান কর্মী নিয়োগ শুরু করলে পরবর্তীতে আর্মেনিয়ান, কপটিকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এখানে বসতি গড়ে তোলে। বর্তমানে শহরের প্রায় ৩০ হাজার বাসিন্দা এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের নিজস্ব গির্জা, টেলিভিশন চ্যানেল, ক্রীড়া সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আফিফ আসালির মতে, শুরুতে মুসলিমরা ধারণা করেছিলেন তারা একসময় নিজ দেশে ফিরে যাবেন। ফলে তারা বড় পরিসরে ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেননি। সে সময় অনেকেই ছোট ছোট কক্ষে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু গত এক দশকে মুসলিম সমাজের বিস্তার ঘটায় এখন মসজিদগুলো আরও পরিচিত এবং কার্যক্রমও বেড়েছে।
স্ক্যানিয়ায় কর্মরত প্রকৌশলী মোহাম্মদ অসীম ফিরোজ সাত বছর আগে সোডারটেলিয়ায় আসেন। এর আগে তিনি যুক্তরাজ্যে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, এখানে এসে প্রথমেই একটি সুসংগঠিত মুসলিম সমাজ এবং দুটি ছোট মসজিদ দেখতে পান, যা তার কাছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ছিল।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের নাগরিক হলেও ধর্মীয় পরিচয় তাদের একত্রিত করেছে। রমজান মাসে বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা একসঙ্গে ইফতারের আয়োজন করেন এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলেন। মুসলমানরা সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না—এমন ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সুইডেনে মুসলিমদের সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ইসলামিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখ হলেও বিভিন্ন গবেষণায় দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ বলে ধারণা করা হয়। তবে জনমত জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ বাস্তব সংখ্যার তুলনায় মুসলিম জনসংখ্যাকে অনেক বেশি মনে করেন।
মুসলিম সমাজের এই সম্প্রসারণ নিয়ে কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে আফিফ আসালি বলেন, গত কয়েক বছরে অমুসলিমদের একাংশের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ অসীম ফিরোজ একটি ঈদুল ফিতরের জামাতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি ভাড়া করা স্পোর্টস হলে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাত নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য দেখা যায়। তার মতে, এসব প্রতিক্রিয়া সমাজের একটি অংশের মনোভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়।
ইসলামিক কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের অপারেশন প্রধান দাউদ ওমর আলী মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞতা থেকেই এমন ভীতি বা ভুল ধারণা তৈরি হয়। তিনি বলেন, সুইডেন বিশ্বের অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ হওয়ায় অনেক মানুষ ধর্ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। ফলে মুসলিম সমাজ সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
তার ভাষ্য, অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা কাউকে দেখলেই মুসলিম বলে ধরে নেওয়া হয়, অথচ তিনি হয়তো একজন অ্যাসিরীয় খ্রিষ্টান। এতে অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ও প্রভাবিত হয়। বিভিন্ন গবেষণাতেও সুইডিশ রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ইসলামকে উপস্থাপনের ধরন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আফিফ আসালি বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেও দেখেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে বসবাস করেও সুইডেনের মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তার মতে, ঈদের জামাতে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ এই সামাজিক সংহতিরই প্রতিফলন।
বর্তমানে সোডারটেলিয়া ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশনের লক্ষ্য শিশুদের জন্য আরও উন্নত কার্যক্রম পরিচালনা, রমজানে সুশৃঙ্খল ইফতারের ব্যবস্থা এবং নতুনদের জন্য মসজিদে আসা সহজ করা। পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে পারস্পরিক সহাবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দাউদ ওমর আলী বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নিজেদের বাস্তব পরিচয় তুলে ধরা একীভূত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজনীতিতে কী বলা হচ্ছে, তার চেয়ে বাস্তব জীবনে মুসলিম সমাজ কীভাবে অবদান রাখছে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, একসময় অ্যাসিরীয় খ্রিষ্টানরা যেভাবে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুলে শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিলেন, মুসলিম সমাজও এখন সেই পথেই এগোচ্ছে। শুরুতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এখন তারা সুইডেনেই স্থায়ীভাবে শিকড় গাড়তে চাইছেন। গত এক দশকে মসজিদকেন্দ্রিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণও সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করছে।
সূত্র : হাইপেন ডট কম
সিএ/এমআর


