ব্যস্ত জীবনযাত্রা, কাজের চাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার বিষয়টি অনেক সময়ই পিছিয়ে পড়ে। অথচ সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন অল্প কিছু সময় নিজের জন্য বরাদ্দ রাখাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা আবারও সেই বার্তাই সামনে আনছেন।
প্রতি বছর ২১ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। বর্তমানে যোগকে শুধু শরীরচর্চার একটি পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠনের একটি সমন্বিত দর্শন হিসেবে দেখা হয়।
যোগের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। সংস্কৃত শব্দ ‘যুজ’ থেকে ‘যোগ’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ সংযুক্তি বা ঐক্য। এর মূল লক্ষ্য শরীর, মন ও আত্মার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
২১ জুনকে যোগ দিবস হিসেবে নির্বাচনের পেছনেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। উত্তর গোলার্ধে এটি বছরের দীর্ঘতম দিন। গত এক দশকে দিবসটি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসচেতনতা আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত যোগচর্চা শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে, পেশি শক্তিশালী করতে, শ্বাসপ্রশ্বাসের দক্ষতা উন্নত করতে এবং হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং বিষণ্নতার মতো সমস্যার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় মানুষ যখন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিকল্প উপায় খুঁজছিল, তখন বিশ্বব্যাপী যোগচর্চার প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যোগচর্চার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগকে শুধু কয়েকটি শারীরিক আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত দর্শন উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা, ইতিবাচক চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনও যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যোগচর্চার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর জন্য ব্যয়বহুল সরঞ্জাম বা বিশেষ অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। ঘরের ছোট একটি জায়গা, একটি যোগম্যাট এবং প্রতিদিন কিছু সময়ই যথেষ্ট। বাসা, কর্মস্থল কিংবা ভ্রমণের মধ্যেও এটি সহজে চর্চা করা যায়।
বিশ্বখ্যাত হৃদ্রোগ সার্জন দেবী শেঠি নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন, একসময় তিনি হাঁটুর ব্যথায় ভুগছিলেন এবং বিভিন্ন চিকিৎসার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছিলেন না। পরে নিয়মিত যোগচর্চা শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত যোগচর্চা অব্যাহত রেখেছেন এবং এর সুফল পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থতার জন্য কোনো অলৌকিক সমাধান প্রয়োজন হয় না। বরং নিয়মিত ও সচেতন অনুশীলন দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর ফল দেয়। যোগচর্চাও সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই একটি অংশ।
তাঁদের ভাষ্য, ব্যস্ততার অজুহাতে আমরা প্রায়ই বলি যে সময় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টা থেকে মাত্র ১৫ মিনিট কি নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য বরাদ্দ রাখা সম্ভব নয়?
আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল বার্তাও এখানেই—নিজের শরীর, মন এবং জীবনের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া। ছোট একটি পদক্ষেপ থেকেই সুস্থতার যাত্রা শুরু হতে পারে, আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হতে পারে আজই।
সিএ/এমআর


