মানুষের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নদী নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প এবং বাঁধ নির্মাণের কারণে বিশ্বের বহু নদীর স্বাভাবিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবিদদের একটি বড় অংশ মনে করতেন, নদীর প্রবাহে তৈরি কৃত্রিম বাধা সরিয়ে দিলে এবং নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে মৎস্যসম্পদও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তবে নতুন একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের পরিবর্তন করা নদী পরিবেশের সঙ্গে মাছেরা শুধু খাপ খাইয়ে নিচ্ছে না, বরং তাদের বিবর্তনের গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, নদীর পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ফলে মাছের শারীরিক গঠন, আচরণ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যে দ্রুত পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
‘ইকো–ইভো–হাইড্রোলিকস: ইন্টেগ্রিটিং ফিশ ইভল্যুশন ইনটু ইকোহাইড্রোলিকস ফর কনজারভেশন’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, নদী সংরক্ষণের প্রচলিত পদ্ধতিগুলো অনেক ক্ষেত্রে মাছের অভিযোজন ও বিবর্তনের বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। বহু নদী বছরের পর বছর ধরে বাঁধ, ব্যারাজ ও জলনিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর প্রভাবে নতুন ধরনের পরিবেশে রূপ নিয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা মাছেরা আগের প্রজন্মের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে বিবর্তনকে দীর্ঘ সময়ের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হলেও পরিবেশগত চাপ বেশি হলে পরিবর্তন অনেক দ্রুত ঘটতে পারে। নরওয়ের একটি নদীতে বাঁধ নির্মাণের প্রায় তিন দশকের মধ্যেই আটলান্টিক স্যামন মাছের শরীরের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষণায় এর সঙ্গে জিনগত পরিবর্তনের সম্পর্কও চিহ্নিত করা হয়েছে।
একই ধরনের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা গেছে। সেখানে নদীকে বাঁধের মাধ্যমে হ্রদে রূপান্তর করার পর ব্ল্যাকটেইল শাইনার মাছের শরীরের গঠনে দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ করা হয়। গবেষকদের মতে, এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে মাছেরা কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছে না, বরং নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তন করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী সংরক্ষণে এতদিন মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মাছের চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নদীর ঐতিহাসিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট চাপের কারণে অনেক নদীর ক্ষেত্রে সেই পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তাঁদের মতে, এখন সংরক্ষণ পরিকল্পনায় মাছের জিনগত বৈচিত্র্য এবং অভিযোজন সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাঁধ বা ব্যারাজ মাছের চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফলে জিনগত আদান-প্রদান কমে যায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে ওঠে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নদী ও মাছের সম্পর্ককে দ্বিমুখী হিসেবে ব্যাখ্যা করা। নদীর পরিবেশ যেমন মাছের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে, তেমনি মাছের আচরণও নদীর ভৌত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনতে পারে। অনেক মাছ খাবার সংগ্রহ বা ডিম পাড়ার সময় নদীর তলদেশের পলি ও নুড়ি সরিয়ে দেয়, যা নদীর স্বাভাবিক গঠন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
উদাহরণ হিসেবে স্যামন মাছের কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। প্রজননের সময় এ মাছ নদীর তলদেশে নুড়ি-পাথর সরিয়ে বাসা তৈরি করে। কিন্তু যদি বিবর্তনের ফলে মাছের আকার ছোট হতে থাকে, তাহলে তাদের পলি ও পাথর সরানোর ক্ষমতাও কমে যাবে। এর ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক বিন্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই পারস্পরিক প্রভাবকে ‘হাইড্রো-ইভল্যুশনারি ফিডব্যাক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গবেষকদের মতে, নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। পরিবেশগত জরিপের পাশাপাশি মাছের জিনগত বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করলে কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বা অভিযোজন ক্ষমতা হারাচ্ছে, তা আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তাঁরা মনে করেন, পরিবেশবিদ্যা, জলবিজ্ঞান এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়োগ নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে। এতে নদীকে একটি পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা এবং মাছকে সেই পরিবর্তনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করা সহজ হবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
সিএ/এমআর


