মানুষ সাধারণত সোজা পথে হাঁটে—এমন ধারণা দীর্ঘদিনের। তবে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। বিজ্ঞানীরা বলছেন, খোলা বা আবদ্ধ কোনো স্থানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দিলে মানুষ অজান্তেই বাঁ দিকে মোড় নেওয়ার প্রবণতা দেখায় এবং ধীরে ধীরে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করে।
স্পেন, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত একাধিক পরীক্ষায় এই আচরণের মিল পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, জাদুঘর, সুপারমার্কেট কিংবা খালি কক্ষ—বিভিন্ন পরিবেশে একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। তবে মানুষ কেন এমন আচরণ করে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
এই গবেষণার সূচনা হয়েছিল একেবারে ভিন্ন একটি উদ্দেশ্য থেকে। করোনা মহামারির সময় স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব নাভারার গবেষক ইনাকি এচেভেরিয়া হুয়ার্তে ও তাঁর সহকর্মীরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে একটি নির্দিষ্ট স্থানে কতজন মানুষ অবস্থান করতে পারে, তা নিয়ে কাজ করছিলেন। সেই গবেষণার ভিডিও বিশ্লেষণের সময় তাঁরা লক্ষ্য করেন, মানুষের চলাচলের মধ্যে একটি অভিন্ন ধারা রয়েছে—অধিকাংশ মানুষ বাঁ দিকে ঘুরে বৃত্তাকারভাবে চলাফেরা করছে।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হয়। কখনো একক ব্যক্তি, কখনো ছোট দলকে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাঁটার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিবারই দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা ধীরে ধীরে বাঁ দিকে মোড় নিচ্ছেন এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরছেন।
গবেষকরা ধারণা করেছিলেন, হয়তো সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা সামাজিক অভ্যাসের কারণে এমনটি ঘটছে। বিষয়টি যাচাই করতে স্পেনের গবেষকদের সঙ্গে জাপানের ইউনিভার্সিটি অব টোকিওর গবেষক ডক্টর ক্লাউদিও ফেলিসিয়ানি যৌথভাবে কাজ করেন। জাপানে পরিচালিত পরীক্ষাতেও একই ফল পাওয়া যায়।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ডানহাতি, ডানপেয়ে বা ডান চোখের আধিপত্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বাঁ দিকে ঘোরার প্রবণতার কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই একই আচরণ দেখা গেছে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট ছিল।
নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ইনাকি এচেভেরিয়া হুয়ার্তে বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই অবচেতনভাবে যেকোনো একদিকে সামান্য হেলে যাওয়ার বা মোড় নেওয়ার একটি ব্যক্তিগত প্রবণতা থাকে। যখন অনেক মানুষ একসঙ্গে কোনো জায়গা শেয়ার করে, তখন সবার সেই ছোট ছোট ব্যক্তিগত প্রবণতাগুলো মিলে সামগ্রিকভাবে একটি ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকের ঘূর্ণন তৈরি করে। এই আচরণের সঠিক কারণ খুঁজতে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এমনকি মানুষের এক পা ভাঙা থাকলে কেমন আচরণ করে, তা-ও পরীক্ষা করা হয়েছে।’
গবেষক ক্লাউদিও ফেলিসিয়ানি বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, এটি কেন ঘটে। তবে এই রহস্যের পেছনের কারণগুলো বুঝতে পারলে আমরা কীভাবে এই পৃথিবীকে অনুধাবন করি ও দেখি, তা আরও গভীরভাবে জানা সম্ভব হবে। এটি আমাদের অন্য কোনো বড় আবিষ্কারের দিকেও নিয়ে যেতে পারে।’
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষই একমাত্র প্রাণী নয়, যারা এমন আচরণ করে। যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা এর আগে একধরনের পিঁপড়ার মধ্যেও অচেনা পরিবেশে বাঁ দিকে মোড় নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মস্তিষ্ক, পেশি এবং শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্যে থাকা জৈবিক বৈশিষ্ট্য বা বায়োমেকানিকস এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই রহস্যের সমাধান হলে ভবিষ্যতে জিপিএস সিমুলেশন, জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা, বড় ভবনের ইভাকুয়েশন মডেল এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থাপনার নকশা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সিএ/এমআর


