দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরীক্ষার পর প্রথমবারের মতো শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে উড়তে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পরীক্ষামূলক বিমান এক্স-৫৯। সুপারসনিক ভ্রমণের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে এই প্রকল্পকে।
নাসা জানিয়েছে, গত ৫ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেস থেকে উড্ডয়ন করে এক্স-৫৯। পরীক্ষামূলক এই ফ্লাইটে বিমানটি টানা ৮১ মিনিট আকাশে অবস্থান করে। অভিজ্ঞ পরীক্ষামূলক পাইলট জিম লেস বিমানটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। উড্ডয়নের সময় বিমানটি প্রায় ৪৩ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় উঠে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭১৩ মাইল বেগে উড়ে শব্দের গতিকে অতিক্রম করে।
বিশ্বে সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমানের ইতিহাসে কনকর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৭৬ সালে যাত্রী পরিবহন শুরু করা কনকর্ড শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে চলতে পারলেও এর উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং বিকট সনিক বুমের কারণে ২০০৩ সালে অবসরে যায়। শব্দের দেয়াল ভাঙার সময় সৃষ্ট তীব্র শব্দই ছিল এর অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা।
এই সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যেই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এক্স-৫৯ প্রকল্পে কাজ করে আসছে নাসা। বিমানটির বিশেষ নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে চললেও প্রচলিত সুপারসনিক বিমানের মতো তীব্র শব্দ তৈরি না হয়।
নাসার এক্স-৫৯ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ক্যাথি বাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সুপারসনিক গতিতে ওড়া এক্স-৫৯ দলের জন্য এক বিশাল অর্জন। বিমানটি যে পরিবেশের জন্য তৈরি করা হয়েছে, ঠিক সেই পরিবেশে এর প্রথম মিশন-কন্ডিশনস ফ্লাইট সম্পন্ন করাটা আমাদের জন্য অনেক অর্থবহ। এখান থেকেই বিমানটিকে যাচাই করার আসল কাজ শুরু হলো।’
বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো বস্তু যখন নির্দিষ্ট পরিবেশে শব্দের গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলে, তখন তাকে সুপারসনিক বলা হয়। আর গতি ম্যাক ৫ অতিক্রম করলে তাকে হাইপারসনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ সুপারসনিক বিমানের ক্ষেত্রে বাতাসে সৃষ্ট চাপ তরঙ্গ একত্রিত হয়ে সনিক বুম তৈরি করে, যা মাটিতে তীব্র বিস্ফোরণের মতো শব্দ হিসেবে শোনা যায়।
এক্স-৫৯-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর লম্বাটে সামনের অংশ। এই নকশা বাতাসে সৃষ্ট চাপ তরঙ্গকে ছড়িয়ে দেয় এবং সেগুলোকে বড় আকারের সনিক বুমে রূপ নিতে বাধা দেয়। ফলে মাটিতে থাকা মানুষ কেবল হালকা ধরনের শব্দ শুনতে পায়।
নাসা এই শব্দকে “কোয়ায়েট সুপারসনিক থাম্প” নামে অভিহিত করছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অনেকটা দূরের মেঘের গর্জন বা কিছুটা দূরে গাড়ির ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের মতো। প্রচলিত সুপারসনিক বিমানের মতো কানে আঘাত করা তীব্র শব্দ এতে তৈরি হয় না।
২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রথমবার আকাশে উড়েছিল এক্স-৫৯। এরপর একাধিক পরীক্ষামূলক ফ্লাইট সম্পন্ন করেছে বিমানটি। সর্বশেষ সফল সুপারসনিক উড্ডয়নের পর এখন আরও উচ্চতা ও গতিতে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছে নাসা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিমানটিকে ৬০ হাজার ফুট উচ্চতায় এবং ঘণ্টায় ১ হাজার ২১৮ মাইল বা ম্যাক ১.৬ গতিতে উড়ানো হবে। একইসঙ্গে বিভিন্ন গতিতে পরিচালিত পরীক্ষামূলক ফ্লাইট থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
ক্যাথি বাম বলেন, ‘এই উড্ডয়নগুলো কেবল এক্স-৫৯-এর কার্যক্ষমতার ওপর আমাদের আস্থাই বাড়াচ্ছে না, বরং আমাদের পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এই মিশনটিই আগামী দিনের সুপারসনিক ভ্রমণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে।’
পরীক্ষার পরবর্তী ধাপে বিমানটির উৎপাদিত শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হবে। এরপর জনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন পরিচালনা করে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করবে নাসা। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ভবিষ্যতে দ্রুতগতির কিন্তু তুলনামূলক শান্ত সুপারসনিক যাত্রার নতুন যুগ শুরু হতে পারে।
সিএ/এমআর


