নিউইয়র্কের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির এক নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় শুরু হয়েছিল এক ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক যাত্রা। সাধারণ এক গবেষণাগারে, সীমিত যন্ত্রপাতি আর দৈনন্দিন ব্যবহারের একটি ব্লেন্ডারকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানী আলফ্রেড হার্শে ও তাঁর সহকারী মার্থা চেজ এমন এক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন, যা জীববিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দেয়।
বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বড় এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—জীবনের জেনেটিক তথ্য বহন করে ডিএনএ, নাকি প্রোটিন? দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই মনে করতেন, জটিল গঠনের কারণে প্রোটিনই এই কাজ করে। অন্যদিকে ডিএনএকে তুলনামূলক সহজ অণু হিসেবে দেখা হতো।
এই বিভ্রান্তি দূর করতে হার্শে ও চেজ ব্যাকটেরিওফাজ নামে এক ধরনের ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। এ ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এবং নতুন ভাইরাস তৈরির নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশ বহন করে কোন উপাদান—ডিএনএ নাকি প্রোটিন—এটাই ছিল মূল প্রশ্ন।
গবেষকরা ডিএনএকে তেজস্ক্রিয় ফসফরাস এবং প্রোটিনকে তেজস্ক্রিয় সালফার দিয়ে চিহ্নিত করেন। এরপর ভাইরাসগুলোকে ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিশিয়ে সংক্রমণ ঘটানো হয়। নির্দিষ্ট সময় পর একটি সাধারণ ব্লেন্ডারের সাহায্যে ব্যাকটেরিয়ার গা থেকে ভাইরাসের প্রোটিন খোলস আলাদা করা হয় এবং সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রে ঘুরিয়ে ভেতর ও বাইরের অংশ পৃথক করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, প্রোটিনের চিহ্ন বাইরে রয়ে গেছে, কিন্তু ডিএনএ প্রবেশ করেছে ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে এবং নতুন ভাইরাস তৈরিতেও অংশ নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়, জীবনের জেনেটিক তথ্য বহন করে ডিএনএ, প্রোটিন নয়।
১৯৫২ সালে প্রকাশিত এই গবেষণা পরবর্তীতে আণবিক জীববিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের পথ সুগম করে। ১৯৬৯ সালে এই অবদানের জন্য আলফ্রেড হার্শে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
এই গবেষণা প্রমাণ করে, বড় আবিষ্কারের জন্য সব সময় জটিল প্রযুক্তি প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো সাধারণ একটি ব্লেন্ডারও হয়ে উঠতে পারে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের হাতিয়ার।
সূত্র: দ্য জার্নাল অব জেনারেল ফিজিওলজি; ব্রুস অ্যালবার্টস, মলিকুলার বায়োলজি অব দ্য সেল; জেমস ওয়াটসন, মলিকুলার বায়োলজি অব দ্য জিন
সিএ/এমআর


