নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। সোমবার বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, গবেষক ও বিশিষ্টজনেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা ছাড়াও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে বই পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। আয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার প্রগতি মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন কুমার রায় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে তোমরা ঘ্রাণ ছড়াবে; তোমাদের মেধা দিয়ে দেশকে নতুন করে গড়ে তুলবে এবং মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করো।’ অনুষ্ঠানে খুলনা বন্ধুসভার সভাপতি স্বর্ণ কমল রায়ের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বিভিন্ন শিক্ষক ও সংগঠক। এ অলিম্পিয়াডে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয় এবং ৩০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।
লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আরেক আয়োজনে বক্তব্য দেন বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন (অব.) আজিজুল হক। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এক সূত্রে গাঁথা এক অনন্য সম্মান ও স্বীকৃতি, যা এমনি এমনি আসেনি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকের মধ্যে লালন ও কাজের মাধ্যমে পালন করতে হবে।’ সেখানে শহরের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয় এবং কুইজ শেষে বিজয়ীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হয়।
গাইবান্ধার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১০১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। আলোচনা সভায় অতিথিরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরেন এবং তরুণদের ইতিহাস জানার আহ্বান জানান। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, ‘ইতিহাস নিয়ে যখন নানা বিভ্রান্তির চেষ্টা চলছে, তখন প্রথম আলোর এই উদ্যোগ আলোর পথ দেখাবে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের হরিমোহন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির ১২০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। আলোচনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয়তো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু একদিন তোমাদের হাত ধরেই এসব চেতনার বাস্তবায়ন হবে—এই বিশ্বাস আমাদের আছে।’
নওগাঁর বোয়ালিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনকে অন্য কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে হবে না। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই বেশি করে পড়তে হবে।’
জয়পুরহাট, নরসিংদী, জামালপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায়ও একই দিনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। কুমিল্লায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ইন্দুভূষণ ভৌমিক বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। আমরা চাই না নতুন প্রজন্ম বিকৃত বা নতুন করে বানানো কোনো ইতিহাস জানুক। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে।’
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শেরপুরের নবারুণ পাবলিক স্কুল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সাতক্ষীরা নবারুণ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং সাভারের গেরুয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজেও একই ধরনের আয়োজন হয়। এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কুইজ প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়।
সাভারে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ও কবি আ খ ম সিরাজুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৭১ সালেই আমার জীবনটা যেতে পারত। আমি যখন মুন্সিগঞ্জের তালতলায় পাকিস্তানিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হই, তখন আমার ডান পাশে থাকা ঢাকার ছেলে ডেমোলিশন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আলাউদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন… একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল এই রকম। কী অবর্ণনীয় কষ্ট আমাদের সহ্য করতে হয়েছে।’
সারা দেশে আয়োজিত এই অলিম্পিয়াডে শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়। পরে ফলাফল ঘোষণা করে বিজয়ীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
সিএ/এমই


