বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই–কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনকে অনেক সহজ করেছে। bKash, Nagad, Rocket এবং Upay–এর মতো সেবাগুলো এখন কোটি মানুষের আর্থিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
এই ডিজিটাল সুবিধার পাশাপাশি বেড়েছে সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও। ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপ ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে প্রতারকরা নানা কৌশলে গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলছে। বিশেষ করে যারা নতুনভাবে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহার করছেন এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন নন, তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এমএফএস ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে এখন কয়েক কোটি ব্যবহারকারী যুক্ত। এই বিশাল গ্রাহকগোষ্ঠী সাইবার অপরাধীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতারণার কৌশলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় আবেগনির্ভর গল্প, ভুয়া লিংক এবং ওটিপি চুরির পদ্ধতি।
প্রতারকরা সাধারণত ফোন বা মেসেজের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা এমন গল্প তৈরি করে যা শুনে মানুষ ভয়, আতঙ্ক বা লোভে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা দাবি করে, ‘আপনার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে, এখনই কোড দিলে বাঁচানো যাবে।’ আবার কখনও বলা হয়, ‘আপনার অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে, রিপোর্ট দেখতে এখানে লগইন করুন।’ কেউ কেউ বলে, ‘ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ টাকা চলে এসেছে, এখনই ফেরত দিতে হবে।’
এ ধরনের কথায় আতঙ্কিত হয়ে অনেক গ্রাহক প্রতারকের নির্দেশনা অনুসরণ করেন। এরপর প্রতারকরা এসএমএস বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি লিংক পাঠায়। এই লিংকটি দেখতে হুবহু ব্যাংকের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মতো মনে হলেও এটি আসলে একটি ভুয়া সাইট। সেখানে ব্যবহারকারী আইডি, পাসওয়ার্ড বা পিন নম্বর দিতে বলা হয়। অনেক সময় ওই লিংকে ক্লিক করলেই মোবাইলে ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার ইনস্টল হয়ে যেতে পারে।
যখন ভুক্তভোগী এসব তথ্য দেয়, তখন প্রতারকরা সেই তথ্য ব্যবহার করে আসল ব্যাংকিং অ্যাপে প্রবেশের চেষ্টা করে। তখন গ্রাহকের ফোনে একটি ওটিপি কোড আসে। ফোনে কথা বলে প্রতারকরা নানা কৌশলে সেই ওটিপিও সংগ্রহ করে নেয়। একবার অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারলে খুব দ্রুত অন্য অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় টাকা স্থানান্তর করে ফেলে তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে কিছু সতর্কতা জরুরি। ব্যাংক কখনো ফোনে বা এসএমএসে লিংক পাঠায় না—এটি মনে রাখতে হবে। যদি কোনো বার্তায় লেখা থাকে ‘Click here to unblock your account’, তাহলে সেটি ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ব্যবহারকারীদের সবসময় ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে হবে। Play Store বা App Store ছাড়া অন্য কোনো লিংক থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত নয়। অপরিচিত বা সন্দেহজনক ফোনকল এলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কেউ যদি বলে ‘আমি ব্যাংক থেকে বলছি, আপনার PIN দিন’, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে ফোন কেটে দিতে হবে। কারণ প্রকৃত ব্যাংক কখনো গ্রাহকের কাছে পিন বা ওটিপি চায় না। কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কোড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
যদি কেউ প্রতারণার শিকার হন, তাহলে দ্রুত ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করতে হবে এবং নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএ/এমআর


