চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছে। এলাকায় বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং মানুষের চলাচলও তুলনামূলক কম দেখা গেছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেক পরিবারের পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়ে বাইরে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১১ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ তল্লাশিচৌকি স্থাপন করা হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত টহল চলছে। এলাকায় নারী ও শিশুদের উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও অধিকাংশ পুরুষ সদস্যকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
এর আগে সোমবার (১০ মার্চ) যৌথ বাহিনীর অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সেখান থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক দিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রবেশ করতে হয়। স্থানীয়ভাবে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে এ সড়ক। সড়ক ধরে কিছু দূর এগোলে এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এলাকা দেখা যায়। বিদ্যালয়ের আশপাশে রয়েছে বাজার, দ্বিতল মার্কেট এবং কয়েকটি দোকান। তবে বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ ছিল।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে পুলিশের একটি অস্থায়ী চৌকি বসানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে বেঞ্চ ও টেবিল ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন পুলিশ সদস্যরা। চৌকির দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাম্পে ১৩০ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। সন্ত্রাসীরা কেউ এখানে নেই।’
বিদ্যালয়সংলগ্ন বাজারে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনিসের সঙ্গে। তিনি বলেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর থেকে বাজারে লোকজনের উপস্থিতি আগের তুলনায় কম।
জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় কথা হয় বাসিন্দা মো. আলমগীরের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়ায়। তিনি জানান, চার বছর আগে সলিমপুর এলাকায় এসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে একটি প্লট কিনে সেখানে ঘর তৈরি করেছেন।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এই বসতিতে সড়কের আশপাশের অধিকাংশ পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। অনেক জায়গায় ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢালে তৈরি হয়েছে বসতি। অনেক জায়গায় দালানকোঠাও দেখা গেছে। এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ এবং খুঁটিও রয়েছে।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের একটি মোড় থেকে তিন দিকে তিনটি রাস্তা চলে গেছে। এর একটি রাস্তা গেছে আলীনগরের দিকে। ওই সড়ক ধরে এগোলে পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে অসংখ্য ঘরবাড়ি দেখা যায়।
একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড পার হয়ে আলীনগর এলাকায় পৌঁছাতে হয়। আগে সেখানে সশস্ত্র পাহারা দেখা গেলেও মঙ্গলবার তা দেখা যায়নি। তবে আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় দ্বিতীয় একটি পুলিশ তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। সেখানে প্রায় ২৩০ জন র্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
এলাকার কয়েকটি বাড়ির সামনে নারী ও শিশুদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের একজন আছিয়া বেগম। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার আতঙ্কে তাঁর স্বামীসহ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কেউ বাড়িতে নেই।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস প্রথম জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন। দখল ধরে রাখতে তিনি একটি নিজস্ব বাহিনীও গড়ে তোলেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশও দীর্ঘদিন কঠিন ছিল।
এই সুযোগে আক্কাসের বাহিনী নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পাহাড়ি খাসজমি প্লট আকারে বিক্রি করতে শুরু করে। পরে প্লট বিক্রির টাকা ও দখল নিয়ে বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আলী আক্কাস নিহত হন।
এরপর তাঁর সহযোগীরা আলাদা আলাদা দল গঠন করেন। তাঁদের মধ্যে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার এবং গাজী সাদেক পৃথক সংগঠন গড়ে তোলেন। বর্তমানে আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াসিন মিয়া। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ নামে আরেকটি সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক।
যাঁরা প্লট কিনে সেখানে বসবাস করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই এই দুটি সমিতির সদস্য। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এ দুটি সমিতির সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।
সিএ/এমই


