আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায় বিচার ও সুরক্ষায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরা দেশি নারী ও শিশুদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আজ সোমবার বেলা ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে সভার আয়োজন করে বহ্নিশিখা ও গ্রিন ভয়েস নামের দুটি সংস্থা।
সভায় বক্তারা জানিয়েছেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতার কারণে দেশে অনেক নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম বলেন, ‘অনেক মামলার রায় পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে ভুক্তভোগী বা বাদী জীবিত থাকাকালেই অনেক সময় তারা ন্যায়বিচার পান না। এজন্য আইন ও প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের ওপরও জোর দিতে হবে।’
গ্রিন ভয়েসের সহসমন্বয়ক মোনছেফা তৃপ্তি তার মূল প্রবন্ধে জানান, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পাঁচ শতাধিক নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা প্রস্তুত তা প্রশ্নবিদ্ধ করে।’
মোনছেফা তৃপ্তি বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সংস্থা (ইউএনএফপিএ)-র ২০২৫ সালের তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৭ হাজার ৬৬টি মামলা দাখিল হয়েছে।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে নারীদের পিছিয়ে থাকার বিষয়েও আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তি ৭ কোটি ১৭ লাখ, যার মধ্যে নারী শ্রমশক্তি ২ কোটি ৩৭ লাখ। নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে এবং প্রায় ১৬ লাখ নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। স্কুলে ন গিয়ে পড়ার হার ২৪.৭৪ শতাংশ এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে (এসটিইএম) নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২১ শতাংশ।
সভায় অংশ নেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, অনেক ইতিবাচক প্রস্তাব থাকলেও জন–আলোচনা খুব সীমিত হয়েছে। কিছু রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনের সময় নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। তিনি সামাজিক মানসিকতা ও প্রচলিত চিন্তাধারার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
গ্রিন ভয়েসের উপদেষ্টা ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘নারীকে সমাজের শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তারা অসাধারণ পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তবে বিচারহীনতার কারণে মাত্র ১১-১৩ শতাংশ ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়। অপরাধীরা শাস্তি না পেলে অপরাধ আরও বাড়ে।’
সভায় সভাপতির বক্তব্যে গ্রিন ভয়েস ও বহ্নিশিখার প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর কবির বলেন, ‘নারী যেন তার জ্ঞান, শক্তি, সাহস ও মনোবল দিয়ে মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারে—সেই সমাজ গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য।’
বহ্নিশিখার রংপুর জেলা সমন্বয়ক সুরাইয়া আখতার দাবিসমূহ তুলে ধরেন, যার মধ্যে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীর চরিত্রগত সাক্ষ্য সুরক্ষা এবং স্থানীয় সালিস ও মীমাংসা প্রথা বন্ধ করা অন্তর্ভুক্ত।
সভায় গ্রিন ভয়েসের সহসমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন, বহ্নিশিখার প্রোগ্রাম সমন্বয়ক ফাহমিদা নাজনীনের উপস্থাপনায় আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখার সদস্যরা।
সিএ/এমই


