ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার জোরবাড়িয়া গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় প্রায় আড়াই শ বছর ধরে টিকে আছে এক গম্বুজবিশিষ্ট ঐতিহাসিক খানবাড়ি মসজিদ। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী, পুরু দেয়াল ও চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং একটি ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।
জোরবাড়িয়া পূর্বভাটিপাড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে খানবাড়ি মসজিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। জানা যায়, ১২০০ হিজরি সালে তৎকালীন প্রভাবশালী ও দানশীল ব্যক্তি হায়াত খান মসজিদটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা এই প্রাচীন মসজিদটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। মসজিদের পাশেই রয়েছে ‘বিবিঘর’ নামে পরিচিত একটি মানতের ঘর। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে অসুস্থতা থেকে মুক্তির আশায় এখানে মানত করার প্রচলন ছিল, যদিও এখন সেই প্রথা প্রায় বিলুপ্ত।
মসজিদটি চৌকো কাঠামোর ওপর নির্মিত এবং এর ছাদজুড়ে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ। প্রায় ৪০ ইঞ্চি পুরু দেয়াল দিয়ে তৈরি স্থাপনাটির ভেতর ও বাইরে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। চার কোণে চারটি পিলার রয়েছে, যার উপরের অংশ কলসি আকৃতির নকশায় অলংকৃত। কথিত আছে, এই মসজিদের নির্মাণকাজে ফ্রান্স থেকে কারিগর আনা হয়েছিল।
মসজিদের সামনে ও পেছনে রয়েছে দুটি পুকুর। পেছনের পুকুরটি প্রায় ৫২ শতাংশ জমির ওপর এবং সামনে শানবাঁধানো ঘাটসহ প্রায় এক একর আয়তনের আরেকটি পুকুর রয়েছে। মসজিদের দুই পাশে রয়েছে কবরস্থান, যেখানে এলাকার মৃত ব্যক্তিদের দাফন করা হয়। মৃত্যুর আগে হায়াত খান মসজিদের নামে সাত একর জমি দান করে যান। সেই জমির আয় থেকেই বর্তমানে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়।
মসজিদের পাশেই স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সাত্তার খান বলেন, ‘এই মসজিদ যখন করা হয়, তখন তো সিমেন্ট ছিল না। চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে এই মসজিদ করা হয়। মানুষের কাছে শুনেছি ফ্রান্স থেকে লোক এনে এই মসজিদটি করা হয়। যিনি এই মসজিদ করেছেন, তিনি অনেক সম্পদশালী ছিলেন। তিনি মসজিদের জন্য সাত একর জমি দান করে গেছেন। এই মসজিদে অনেক দূরদূরান্তের লোক আসে। এখন পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ হলেও আমাদের এই মসজিদে এমনিই লোক ভরপুর থাকে।’
আসরের নামাজ শেষে বের হওয়া মুসল্লি মো. মোনায়েম খান বলেন, ‘এই মসজিদ অনেক পুরোনো। এই মসজিদের কারুকার্য ভেঙে গেলে সেগুলো মেরামত করা হয়েছে গেল বছর। এই মসজিদটি ঐতিহ্যের জন্য এখনো চালু রাখা হয়েছে। এই মসজিদে নামাজ পড়তে খুব ভালো লাগে। গরমের দিন ঠান্ডা ও শীতে গরম অনুভূত হয়। প্রকৌশলীরা বলে গেছেন, আরও এক থেকে দেড় শ গেলেও মসজিদের কিছু হবে না।’
মসজিদের ইতিহাস তুলে ধরে জোরবাড়িয়া পূর্বভাটিপাড়া খানবাড়ি জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম খান বলেন, ‘এই মসজিদ ১২০০ হিজরিতে নির্মিত হয়। হায়াত নামের একজন এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁরা (হায়াত খান) তিন ভাই ছিলেন। এর মধ্যে হায়াত খানের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একটিমাত্র কন্যাসন্তান ছিল। নিজে জমি দান করে তিনি এই মসজিদ করেছেন, মসজিদের দুপাশে গোরস্থান রয়েছে, মসজিদের সামনে পুকুর রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই এলাকায় প্রথম এই মসজিদ হয়। তখন আশপাশে কোথাও মসজিদ ছিল না। এই মসজিদে এক কিলোমিটার দূর থেকে মানুষ এসে জুমার নামাজ আদায় করত। মসজিদের উত্তর পাশে একটি ঘর রয়েছে। এটিকে বিবির ঘর বলা হতো। মুরব্বিরা তাঁদের বলেছেন, এই ঘর নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষ আগে অসুখ-বিসুখ হইলে বিবির ঘরে শিরনি মানত। শিরনি এনে সেই ঘরে রাখতেন এবং মুসল্লিরা জুমার নামাজ পড়ে সেই শিরনি খেয়ে দোয়া করতেন।’
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মজিবুর রহমান খান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মসজিদ করে গেছেন। এই মসজিদ পরিচালনায় কোনো দান গ্রহণ করা হয় না। নিজেরাই অর্থের জোগান দিয়ে এটি পরিচালনা করা হয়।’
সিএ/এমই


