বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই সময়ে মানবসভ্যতা যেন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সৌরজগতের প্রতিবেশী গ্রহগুলোর মধ্যে মঙ্গলকে সম্ভাব্য দ্বিতীয় আবাস হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। লাল গ্রহকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এমন উদ্যোগ এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। মানব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গ্রহান্তরে বসতি স্থাপনের ভাবনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—মঙ্গলে যদি আদি অণুজীবের অস্তিত্ব থাকে, সেখানে মানব বসতি গড়া কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে?
এক বক্তৃতায় তরুণদের সামনে এমন প্রশ্ন উত্থাপন করলে কয়েকজন স্পষ্টভাবে ‘না’ বলে মত দেন। এই প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক সংবেদনশীলতার দিকটি তুলে ধরে। তারা কেবল নিজেদের স্বার্থ নয়, সম্ভাব্য অন্য প্রাণের স্বাধীন বিকাশের অধিকারকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির বাস্তবতায় সেই সহনশীলতার প্রতিফলন কতটা দৃশ্যমান—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিজ্ঞান মানুষের চিন্তায় নমনীয়তা এনেছে, বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। কিন্তু সেই বৈজ্ঞানিক চেতনা সমাজে পুরোপুরি আত্মস্থ হয়নি। রাজনীতি ও বিজ্ঞানের মধ্যে দূরত্ব এর অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে বিজ্ঞান ও সমাজ-সভ্যতার মধ্যে সুষম সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করলেও সাংস্কৃতিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় মানসিক প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি।
গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি পৃথিবীকে একটি অভিন্ন আবাস হিসেবে স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে তা বহুত্ববাদ ও বৈচিত্র্যের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে মানুষকে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি হাতে পেয়েও সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি অনেক সমাজ। ফলে একধরনের বিভ্রান্তিকর অবস্থা তৈরি হয়েছে—যন্ত্রে উন্নত, কিন্তু চেতনায় অপরিণত। এই অবস্থাকেই লেখক প্রযুক্তির বয়ঃসন্ধিকাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইতিহাস দেখায়, অসহিষ্ণুতা বারবার জ্ঞানচর্চার ক্ষতি করেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দের আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগারের ধ্বংস কিংবা উনবিংশ শতাব্দীর জার্মানির গোটিংগেনের সৃজনশীল পরিবেশের পতন—সবই মানুষের লোভ ও এককেন্দ্রিকতার ফল। একই সঙ্গে মহাজাগতিক ঝুঁকিও রয়েছে। অতীতে গামা রশ্মির বিস্ফোরণের মতো ঘটনা যদি পৃথিবীর আরও কাছে ঘটত, মানব অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যেতে পারত।
কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো মৃত্যুর আগে মানবজাতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংও সতর্ক করেছিলেন যে অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত গবেষণা অগ্রগতি সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা বিপজ্জনক হতে পারে। শিল্পবিপ্লব মানুষের শ্রম কমালেও জীবাশ্ম জ্বালানির অপব্যবহার পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু সংকট ডেকে এনেছে।
সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বৈজ্ঞানিক চেতনার বিকাশ জরুরি। অন্যথায় প্রযুক্তির এই বয়ঃসন্ধিকাল মানবসভ্যতাকে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সিএ/এমআর


