Thursday, July 9, 2026
25.8 C
Dhaka

৭ মার্চের ভাষণ: রাজনৈতিক কৌশল ও মুক্তির আহ্বান

১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানে জমে ওঠা রাজনৈতিক ক্ষোভ দ্রুত রূপ নেয় সুসংগঠিত অসহযোগ আন্দোলনে, যা অল্প সময়ের ব্যবধানে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, গণতান্ত্রিক রায়ের অবমূল্যায়ন এবং সামরিক শাসনের কঠোর অবস্থান মিলিয়ে পরিস্থিতি এক বিস্ফোরণমুখর বাস্তবতায় পৌঁছে যায়। সেই ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রাধান্যে পূর্ব পাকিস্তান দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের ছয় দফা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, বরং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে তৎকালীন সামরিক শাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ‘এক ইউনিট’ ব্যবস্থা ভেঙে দেন। এর লক্ষ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং পূর্ব পাকিস্তানের সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব সীমিত রাখা। একই সময়ে ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ বা এলএফও জারি করে শর্ত দেওয়া হয়, নির্বাচিত গণপরিষদকে ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে, অন্যথায় পরিষদ বাতিল হবে।

সামরিক নেতৃত্বের ধারণা ছিল, নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। কিন্তু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এতে সামরিক জান্তার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ভেঙে পড়ে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক নেতৃত্ব পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন, ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। তবে ১ মার্চ বেলা ১টা ৫ মিনিটে রেডিও ভাষণে তিনি অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

ঢাকার রাজপথে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ শুরু হয়। জগন্নাথ কলেজ, কায়েদে আজম কলেজের শিক্ষার্থী, আদমজী পাটকলের শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হোটেল পূর্বাণীতে বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ ও ৩ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল এবং ৭ মার্চ জনসভার ডাক দেন।

২ মার্চ ঢাকায় কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়। প্রশাসন, ব্যবসা ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। একই রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারি করলে জনতা তা অমান্য করে। গুলিবর্ষণে বহু মানুষ হতাহত হন। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু কর-খাজনা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন। ৪ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে লাগাতার হরতাল পালিত হয়। শিক্ষক, পেশাজীবী ও সাংবাদিকরাও আন্দোলনে সমর্থন জানান। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সামরিক নিয়ন্ত্রণ অমান্য করে ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ ও ‘ঢাকা টেলিভিশন’ নামে সম্প্রচার শুরু করে।

৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ঘোষণা দেন, তবে ভাষণের সুর ছিল কঠোর। তিনি চলমান সংকটের জন্য বঙ্গবন্ধুকে দায়ী করেন এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের ইঙ্গিত দেন।

এই প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চ তৎকালীন রমনার রেসকোর্স ময়দান, বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এ ঐতিহাসিক ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। একদিকে ছিল স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণার জনচাপ, অন্যদিকে সামরিক হুমকি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা। তিনি সরাসরি বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা না দিয়ে চারটি শর্ত উত্থাপন করেন: সামরিক আইন প্রত্যাহার, জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, গোলাগুলি বন্ধ করে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন এবং বাঙালি হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত।

এই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। ভাষণে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়েতে পারবা না।…এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ভাষণের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়।

সিএ/এমই

spot_img

আরও পড়ুন

উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত

উচ্চ কোলেস্টেরল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। রক্তে...

ট্রাম্পের মিম কয়েনে বিনিয়োগকারীদের বড় লোকসান, ক্ষতি ৩৮০ কোটি ডলারের বেশি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে চালু হওয়া মিম কয়েনে...

আপনার পছন্দ অনুযায়ী কথা বলবে অ্যাপলের সিরি, আসছে নতুন নিয়ন্ত্রণ সুবিধা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সহকারী সিরিকে আরও স্বাভাবিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং...

খাওয়ার পর পেটব্যথা কেন হয়, কোন লক্ষণ কী সমস্যার ইঙ্গিত দেয়

খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা শুরু...

গুগলের নতুন পিক্সেল ১১ সিরিজ উন্মোচন ১২ আগস্ট, কী কী পরিবর্তন আসতে পারে

নতুন প্রজন্মের পিক্সেল স্মার্টফোন উন্মোচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে...

নরওয়েতে দ্রুত বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা, কমছে চার্চের সদস্য

ইউরোপের দেশ নরওয়েতে ধর্মীয় জনসংখ্যার চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা...

সুইডেনে পেশাজীবী মুসলিমদের নতুন বাস্তবতা: সুযোগের পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক চ্যালেঞ্জ

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত সোডারটেলিয়া শহরে গত এক...

প্যারাগুয়েতে মুসলিমদের জীবনযাপন: ছোট একটি সম্প্রদায়ের ধর্মচর্চা, ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই কম হলেও...

পরকালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন ৩ উপায়ে

পৃথিবীর জীবনে মানুষ নানা পরিকল্পনা করলেও একটি সত্য থেকে...

যে কৌশলে মিসর বিজয় করেছিলেন সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)

মুসলিম ইতিহাসে সাহস, কূটনৈতিক দক্ষতা ও রণকৌশলের জন্য বিশেষভাবে...

তীব্র তাপপ্রবাহে সবার জন্য খুলে দেওয়া হলো ফ্রান্সের কয়েকটি মসজিদ

তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ফ্রান্সে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে কয়েকটি মসজিদের...

নরওয়ের উত্তরে মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে আল-রহমা ও আন-নূর মসজিদ

উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত নরওয়ের ছোট শহর ত্রোমসোতে গড়ে...

ফেরাউনের সামনে যেভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন হজরত মুসা (আ.)

হজরত মুসা (আ.) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বার্তা...

কাতারে উদ্বোধন হলো প্রথম স্মার্ট মসজিদ, কমবে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার

কাতারে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট মসজিদ উদ্বোধন...
spot_img

আরও পড়ুন

উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে যেসব খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত

উচ্চ কোলেস্টেরল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা ধমনীর ভেতরে জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।...

ট্রাম্পের মিম কয়েনে বিনিয়োগকারীদের বড় লোকসান, ক্ষতি ৩৮০ কোটি ডলারের বেশি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে চালু হওয়া মিম কয়েনে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ১০ লাখ বিনিয়োগকারী। একটি ক্রিপ্টো বিশ্লেষক...

আপনার পছন্দ অনুযায়ী কথা বলবে অ্যাপলের সিরি, আসছে নতুন নিয়ন্ত্রণ সুবিধা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সহকারী সিরিকে আরও স্বাভাবিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং ব্যবহারবান্ধব করে তুলতে নতুন সুবিধা যুক্ত করছে অ্যাপল। সর্বশেষ পরীক্ষামূলক সংস্করণে ব্যবহারকারীরা এখন সিরির কথা...

খাওয়ার পর পেটব্যথা কেন হয়, কোন লক্ষণ কী সমস্যার ইঙ্গিত দেয়

খাবার খাওয়ার পর অনেকেরই পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা শুরু হয়। কারও ক্ষেত্রে এটি জ্বালাপোড়ার মতো অনুভূত হয়, যা ধীরে ধীরে বুক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে...
spot_img