জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাহকরা ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক মাসের ব্যবধানে কোনো কোনো বাড়ির বিল বেড়েছে দ্বিগুণ, আবার কারও ক্ষেত্রে তিনগুণ থেকে ছয়গুণ পর্যন্ত। ভুক্তভোগীরা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে কালাই পৌরশহরের তালুকদার পাড়া মহল্লায়। প্রবাসী মো. মোরশেদ তালুকদার দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। গত ডিসেম্বরে দেশে এসে নিজ বাড়িতে এক মাস অবস্থান করেন এবং তখন পল্লীবিদ্যুতের সংযোগ নেন। বাড়িতে ব্যবহার হয় পাঁচটি পাখা, দশটি বাতি, একটি ফ্রিজ ও একটি টেলিভিশন। দেশে না থাকলে কেবল বাইরের তিনটি বাতি জ্বলে।
ডিসেম্বর মাসে তার বিদ্যুৎ বিল আসে মাত্র ৮৭২ টাকা। জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ চলাকালে ৮০০ ইউনিট ব্যবহার হয়, বিল হয় ৯ হাজার ২৬৭ টাকা। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে বিল আসে ৬১ হাজার ১০ টাকা, যেখানে ব্যবহার দেখানো হয় ৪ হাজার ১৫০ ইউনিট। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মিটার রিডিং ৪ হাজার ৯২৯ ইউনিট হলেও বিলের কাগজে উল্লেখ করা হয়েছিল ৮ হাজার ৮৮০ ইউনিট। পরে অভিযোগ জানালে সংশোধন করে ১ হাজার ৪৭ টাকার বিল দেওয়া হয়।
বাড়ির কেয়ারটেকার শহিদুল ইসলাম বলেন, ভুল স্বীকার করে অফিস বিল ঠিক করলেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
শুধু একটি পরিবার নয়, গত দুই-তিন মাস ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ উঠছে। কালাই কলেজপাড়ার বাসিন্দা কাজী তানভিরুল ইসলাম জানান, তার মাসিক বিল সাধারণত ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে থাকে। ডিসেম্বরে বিল ছিল ৮১০ টাকা, জানুয়ারিতে আসে ৩ হাজার ১১০ টাকা। বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে জানানো হয় আগের বকেয়া যুক্ত হয়েছে, তবে নিয়মিত বিল পরিশোধের পরও কেন বকেয়া যুক্ত হলো, তা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
পুনট ইউনিয়নের শিকটা গ্রামের আব্দুল কাফি জানিয়েছেন, তার মাসিক বিল ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ১ হাজার ২২৫ টাকা। একই গ্রামের স্কুলশিক্ষক রেজাউল করিম অভিযোগ করেন, বাড়িতে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও বিল দ্বিগুণের বেশি এসেছে। তিনি বলেন, মিটার রিডিং নিয়মিত না নেওয়া বা অনুমাননির্ভর হিসাবের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
হাতিয়র গ্রামের গৃহিণী শামসুন্নাহার বেগম জানান, তাদের পরিবারের বিল হঠাৎ ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আঁওড়া গ্রামের ব্যবসায়ী আলম হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা আর্থিক চাপে পড়েছেন। ধুনট গ্রামের কৃষক মাহবুবর রহমান অভিযোগ করেন, প্রতি মাসে বিল বাড়ছেই এবং অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সঠিক ব্যাখ্যা পাননি।
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কালাই জোনাল কার্যালয় সূত্র জানায়, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ৪৭ হাজার ১০ জন গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তাদের সরবরাহের জন্য ৮৭৭ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ কোটি ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয় ও সরবরাহ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, চলতি মাস থেকে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে।
কালাই জোনাল কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. জোবায়ের আলী বসুনিয়া বলেন, ‘বিল বেশি করার কোনো সুযোগ নেই। কোথাও ভুল হলে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সংশোধন করা হচ্ছে।’ প্রবাসীর বাড়ির বিল বৃদ্ধির ঘটনাকে তিনি ‘ভুল’ হিসেবে স্বীকার করে জানান, গ্রাহক অফিসে আসার পরপরই সংশোধনী বিল দেওয়া হয়েছে।
সিএ/এএ


