অনেক প্রত্যাশার পর ১৩তম জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এই ফলাফল কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি জনগণের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা। মানুষ ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে তারা কেমন শাসনচর্চা, রাজনৈতিক পরিবেশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে দ্রুত বদলেছে। একসময় কৃষিনির্ভর দেশ এখন শিল্প, শহর, প্রবাসী আয়, প্রযুক্তি ও তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর দাঁড়িয়ে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে এসেছে, নতুন মধ্যবিত্তের স্বপ্ন বড় হয়েছে। তবুও উন্নয়ন মানুষের জীবনের অস্থিরতা কমাতে পারছে না। মূল্যস্ফীতি, চাকরির নিরাপত্তা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ—এই বাস্তবতা ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বিএনপির এই জয় কেবল আবেগ নয়; এটি দেশের স্বাভাবিকতায় ফেরার বার্তা।
এবারের মূল চ্যালেঞ্জ হলো, বিএনপি কি কেবল সরকার গঠন করবে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন ধারা তৈরি করবে। বিরোধী দল থাকলে ভাষা হয় প্রতিবাদ, সরকারে দায়িত্ব আসে। তারা কি ক্ষমতার প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাষ্ট্রচর্চার চরিত্র বদলাতে চেষ্টা করবে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চক্রে সরকার বদলেছে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার কাঠামো বদলায়নি। এবার মানুষ চায় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের বাইরে দাঁড়াক, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ নয়, সেবার মানদণ্ড হোক।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাজারে স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান ও নীতির ধারাবাহিকতা এখন মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রে। বাংলাদেশের জিডিপি এখন ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীলতা ও আস্থা জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় ভারসাম্য বজায় রেখে নাগরিক সমতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক।
বিএনপির জন্য সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়েও ভারসাম্য প্রয়োজন। গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিন নয়; এটি প্রতিদিনের আচরণে প্রমাণিত হয়। বিরোধী মতকে শত্রু নয়, অংশীদার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাই সঠিক প্রশাসনের চাবিকাঠি।
রাষ্ট্র পুনর্গঠন মানে কেবল সরকার বদল নয়। এর অর্থ নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনের দলীয়করণ কমানো এবং স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা। ডিজিটাল যুগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বিলাসিতা নয়, শাসনের মৌলিক শর্ত। তরুণ প্রজন্মের জন্য বাস্তব সংস্কার দেখানো এখন অগ্রাধিকার।
এই নির্বাচন সমাপ্তি নয়, এটি শুরু। ভোট দিয়ে মানুষ অনুমতি দেয়নি, দায়িত্ব দিয়েছে। এখন সেই দায়িত্বের মূল্য দিতে হবে কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে। বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে শক্তিশালী, দায়িত্বশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের রাজনীতির জন্য।
সিএ/এসএ


