অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছে সরকার। এতদিন এই তালিকায় যেখানে ১৩৫টি ওষুধ ছিল, সেখানে নতুন করে আরও ১৩৫টি যুক্ত হয়ে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৫-এ। তালিকাভুক্ত এসব ওষুধ সরকারের নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে ওষুধ শিল্প মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলেও স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধ আরও সহজলভ্য হবে।
৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সভায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতির অনুমোদনও দেওয়া হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করা হয়েছে। এখন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ২৯৫।’
তিনি বলেন, ‘এই ওষুধগুলোর মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে। তালিকায় থাকা এসব ওষুধ দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মেটাবে এবং এসব ওষুধ দেশের মানুষের ৮০ শতাংশ রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতি তৈরির জন্য টাস্কফোর্স ও কমিটি করা হয়েছিল। এ টাস্কফোর্স ও কমিটি ওষুধবিশেষজ্ঞ, ওষুধশিল্প মালিক, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও পরামর্শক, গবেষকসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে পৃথক সভা করেছে ও তাঁদের সুপারিশ নিয়ে তালিকা ও নীতি চূড়ান্ত করেছে।’
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের মানুষের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয় ওষুধ কিনতে। এই ব্যয়ের চাপ কমাতেই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ এবং মূল্য নির্ধারণ নীতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রীতিনীতি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, সরকার নিয়মিতভাবে ওষুধের দাম পুনর্নির্ধারণ না করায় অনেক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে আগ্রহ হারিয়েছিল। মূল্য নির্ধারণ দীর্ঘদিন স্থবির থাকায় কোম্পানিগুলো এমন আইপি ওষুধে জোর দেয়, যেগুলোর দাম তারা নিজেরা নির্ধারণ করতে পারে।
তিনি বলেন, চিকিৎসকরাও সেসব ওষুধ বেশি প্রেসক্রাইব করতেন। ফলে বাজারে কম দামের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ পাওয়া যেত না এবং সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে তুলনামূলক বেশি দামের ওষুধ কিনতে হতো।
অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ আরও বলেন, ‘নতুন নীতিতে ফর্মুলাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ কার্যকর হলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ আবার বাজারে আসবে এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাবে। এতে জনগণ সরাসরি উপকৃত হবে।’ তিনি জানান, এই নীতির লক্ষ্য হলো—কোম্পানিগুলো যেন ক্ষতির মুখে না পড়ে, আবার অতিরিক্ত মুনাফাও না করে।
তার মতে, এই ব্যবস্থায় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রিত মুনাফা করবে এবং আগ্রাসী মার্কেটিংও কমে আসবে। কারণ ফর্মুলাভিত্তিক দামের মধ্যে অতিরিক্ত মার্কেটিং ব্যয় করলে তা কোম্পানির নিজস্ব মুনাফা থেকেই বহন করতে হবে, দাম বাড়িয়ে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
অন্যদিকে ওষুধ শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে ভিন্নমত উঠে এসেছে। ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে মন্ত্রণালয় তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। তিনি জানান, প্রাইসিং সাব কমিটির কাছে তারাই অনুরোধ করে গিয়ে নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে তারা এ বিষয়ে কিছু সংবাদ দেখেছেন। তবে কোন কোন ওষুধ অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় যুক্ত হয়েছে এবং দাম নির্ধারণে কী নীতি নেওয়া হয়েছে—সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য তারা পাননি।
সিএ/এএ


