আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ গ্রহণকে অনেক দেশ স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঋণের সঙ্গে যুক্ত সুদ, শর্ত এবং পরিশোধের চাপ অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।
ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় উভয় পর্যায়ে ঋণের বোঝা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঋণের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম ঋণকে নিষিদ্ধ না করলেও প্রয়োজন ছাড়া ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহ দেয়। কারণ ঋণ মানুষের স্বাধীনতা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করতে পারে।
রাসুল (সা.) ঋণ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। সাহাবিরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, “মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন সে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৭)
রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ একটি দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
সুদের প্রভাব
বৈদেশিক ঋণের বড় অংশের সঙ্গে সুদের বিষয়টি জড়িত থাকে। ইসলামী অর্থনীতিতে সুদ বা রিবাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৮-২৭৯)
ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে সুদভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো
ইসলামে মুদারাবা ও মুশারাকার মতো অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। যেখানে লাভ ও ক্ষতির অংশীদারিত্ব থাকে এবং একতরফা সুদের চাপ থাকে না।
আধুনিক সময়ে ইসলামি সুকুক বা বন্ডভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা বৈদেশিক ঋণের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে।
স্বনির্ভরতার গুরুত্ব
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়েরই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। নিজস্ব সম্পদ, উৎপাদন ও আয় ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কারো পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে এনে তা বিক্রি করা, কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে অনেক উত্তম—যার সামনে সে হাত পাতল সে তাকে দিক বা না দিক।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৭০)
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশ যদি দেশীয় উৎপাদন বাড়ায়, রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনে এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ উৎসাহিত করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।
সিএ/এমআর


