গভীর সমুদ্রে গবেষণা জোরদার ও বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। গবেষণা জাহাজ আর ভি ড. ফ্রিডটজফ নানসেনের মাধ্যমে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম নিয়ে পরিচালিত জরিপ ও গবেষণার প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। এ উপলক্ষে সেখানে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
জানা গেছে, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়। এতে আট দেশের মোট ২৫ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের। বৈঠকে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী গবেষণা-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন।
তিনি জানান, এ গবেষণায় নতুন ৬৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রে জেলি ফিশের আধিক্য মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এটা ইমব্যালেন্সের লক্ষণ। ওভারফিশিংয়ের কারণে এটি হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, দুই হাজার মিটার গভীরতায়ও প্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
গবেষণায় ২০১৮ সালের একটি গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় আকারের মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বল্প গভীরতার সমুদ্রে মাছ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে বলেও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
এছাড়া জানা গেছে, বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ফিশিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি ট্রলার সোনার ব্যবহার করে টার্গেটেড ফিশিং করছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে পারা জেলেরা লাভবান হলেও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরা জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
মৎস্য উপদেষ্টা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এভাবে টার্গেটেড ফিশিং হলে বঙ্গোপসাগর মাছ শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনার ফিশিং নিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’ গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ডিপ সি ফিশিংয়ের ক্ষেত্রে টুনা মাছের আধিক্য রয়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি ফিশিং নার্সারি শনাক্ত হয়েছে, যা সংরক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের দেশের স্থলভাগ যতটুকু তার সমপরিমাণ অঞ্চল জলভাগেও আছে। কিন্তু এই সম্পদগুলো আমরা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারিনি; এমনকি সম্পদের পরিমাণ কী, সম্ভাবনা কেমন তাও জানতে পারিনি। আমাদের এ সম্পদকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। সেজন্য পর্যাপ্ত গবেষণা, পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন হবে।’
সভায় আরও জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির একটি বহুমুখী হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই ভেসেলটি সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা ও অন্যান্য সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ করবে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এ বিষয়ে যাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আছে তাদের সাথে গবেষণা সমন্বয় করতে হবে। এর মধ্য দিয়েই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে।’
সিএ/এএ


