Wednesday, June 10, 2026
34.9 C
Dhaka

বিতর্কিত আইনে তীব্র সমালোচনা, আদালতে চ্যালেঞ্জ

সন্ত্রাসবাদ–সংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ রেখে একটি বিল পাস করেছে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট। সোমবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ৬২ জন আইনপ্রণেতা বিলটির পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ৪৮ জন আইনপ্রণেতা। একজন আইনপ্রণেতা ভোটদানে বিরত ছিলেন এবং আরও কয়েকজন ভোটের সময় পার্লামেন্টে উপস্থিত ছিলেন না। বিলটি উত্থাপন করেন দেশটির কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির।

বিল অনুযায়ী, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের কোনো ফিলিস্তিনি যদি ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে ইসরায়েলি সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাঁর স্বাভাবিক শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এই শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

ভোটাভুটির আগে বেন গভির ফাঁসির দড়ির আকৃতির একটি ল্যাপেল পিন পরে পার্লামেন্টে উপস্থিত হন, যা এই আইনের প্রতি তাঁর সমর্থনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। বিল পাস হওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি! আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমরা তা বাস্তবায়ন করেছি।’

আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলের ফৌজদারি আদালতে কেউ যদি ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলোপের উদ্দেশ্যে ইসরায়েলি নাগরিক বা বাসিন্দাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্য নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কারও মৃত্যু ঘটানোর’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

বিলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে, যদিও সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত তা স্থগিত রাখা যেতে পারে।

সমালোচকেরা বলছেন, এই আইন মূলত ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়েছে। কারণ ইসরায়েলিদের হত্যা করে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে দোষী সাব্যস্ত ইহুদি ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে না।

কাউন্সিল অব ইউরোপ এই বিলকে ‘গুরুতর পশ্চাদগতির’ ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সন্ত্রাসবাদের দায়ে দোষী ব্যক্তিদের জন্য নিজস্ব আইন ও শাস্তি নির্ধারণ করা ইসরায়েলের সার্বভৌম অধিকার।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিলটির তীব্র সমালোচনা করেছে। ইসরায়েলের অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস এক বিবৃতিতে বলেছে, বিলটি দুটি সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা মূলত ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগের জন্যই করা হয়েছে।

ইসরায়েলভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আদালাহর আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি সমন্বয়ক মিরিয়াম আজেম বলেন, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও দমন–পীড়ন বেড়েছে এবং নতুন আইন সেই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

বিলটির নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও। তাদের মতে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। গাজাভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন হামাস বলেছে, এই আইন ইসরায়েলের ‘হত্যা ও সন্ত্রাসের ওপর ভিত্তি করা’ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

এদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি বিলটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি অঙ্গীকারকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আইনটি বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এই আইন নিষ্ঠুরতা, বৈষম্য এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞার প্রকাশ।

সিএ/এমই

spot_img

আরও পড়ুন

২০৫০ সালের পথে: যেসব প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের পৃথিবী

প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন,...

নাব্যতা সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় চাপে বাঘাবাড়ী নৌবন্দর

উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দর...

কাজির ভাত খাওয়া নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী

দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো ‘কাজির...

হাইতির নতুন ‘গ্যাং সাপ্রেশন ফোর্স’-এ অংশ নেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত...

সিলেটে স্কুলছাত্রের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, মিলেছে হাতে লেখা চিরকুট

সিলেট নগরীর সুবিদবাজার মিয়া ফাজিলচিশত এলাকার একটি আবাসিক ভবন...

কৈশোরের সম্পর্ক নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের...

এল নিনোর প্রভাবে বাড়তে পারে রোগের ঝুঁকি, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক...

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯৩ নারী কারাগারে, স্বাধীনতার পরও কার্যকর হয়নি কোনো ফাঁসি

দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ৯৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি...

প্রকৃত প্রয়োজন ছাড়া মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া নিরুৎসাহিত করেছে ইসলাম

ইসলাম আত্মমর্যাদা, পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা দেয়। এ কারণে...

বন্ধুত্বের আড়ালে স্বার্থপরতা চিনবেন যেভাবে

বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তবে সব সময়...

ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে তদন্তের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক ও নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তদন্তের দাবি...

শিশুদের বিকাশে বাধা হতে পারে অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার

রাস্তাঘাট, রেস্তোরাঁ কিংবা ঘরের ভেতরে এখন ছোটদের হাতে স্মার্টফোন...

মোবাইলেই দেখা যাবে বিশ্বকাপ, থাকছে একাধিক প্ল্যাটফর্ম

ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশে দর্শকদের উন্মাদনা প্রতি আসরেই নতুন...
spot_img

আরও পড়ুন

২০৫০ সালের পথে: যেসব প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের পৃথিবী

প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান গবেষণা ও উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে এমন অনেক...

নাব্যতা সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় চাপে বাঘাবাড়ী নৌবন্দর

উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দর বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। নাব্যতা সংকট, পর্যাপ্ত জেটির অভাব এবং আধুনিক পণ্য পরিবহন সুবিধার ঘাটতির...

কাজির ভাত খাওয়া নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী

দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো ‘কাজির ভাত’। বিশেষ প্রক্রিয়ায় চাল কয়েকদিন পানিতে রেখে গাঁজনের মাধ্যমে এটি প্রস্তুত করা হয়। এ ধরনের...

হাইতির নতুন ‘গ্যাং সাপ্রেশন ফোর্স’-এ অংশ নেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। জাতিসংঘের নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাইতিতে গঠিত ‘গ্যাং সাপ্রেশন ফোর্স’-এ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও...
spot_img